চীন-ভারত যুদ্ধ হলে প্রভাব হবে ভয়ংকর 

তপন চক্রবর্তী

ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর তার নিন্দা জানিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ভারত সরকার। পক্ষান্তরে চীন সরকার সে সময় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতম সামরিক ও কৌশলগত বন্ধু হওয়ায় প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। উপরন্তু ১৯৭১-৭২ সালে চীন সরকার পাকিস্তানের কাছে ‘উপহার’ হিসেবে পাঠিয়েছিল ২৫৫টি ট্যাংক, এক স্কোয়াড্রন ইল-২৮ বিমান ও ২০০ সামরিক প্রশিক্ষক। ১৯৭২ সালে বিভক্ত পাকিস্তানের দায়িত্ব গ্রহণের পর চীন সফরে গিয়ে ভুট্টো একাত্তরে তার দেশকে সার্বিক সহযোগীতা করার জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, তা রচিত হয়েছে ভারত সরকারের সহায়তায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশ ভূমিকা রাখতে পারেনি। ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করেছে এবং বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারও দায়িত্ব পালন করেছে ভারতে থেকে। বলা যায়, ভূ-রাজনৈতিক এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন ও ভারতের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্কের সমীকরণ মাথায় রেখেই পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান পরিকল্পিতভাবে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সেই চীন যখন দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ভারতের নিয়ন্ত্রণরেখা লাগোয়া রাস্তা দখল নিয়ে সংঘর্ষে জড়ালো, তখনও নিশ্চুপ পাকিস্তান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীনের উহানে পরীক্ষাগার থেকেই করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। এছাড়া কীভাবে চীন থেকে করোনা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লো, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে সোচ্চার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন।

সবাই যখন চীনকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত ঠিক সে সময়েই সবার দৃষ্টি ফেরাতে সীমান্ত নিয়ে নতুন খেলা শুরু করেছে চীন সরকার। সোমবার (১৫ জুন) রাতে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষে মৃত্যু হয় ২০ জন ভারতীয় সেনার। ভারত সরকারের দাবি, চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা না মানার কারণেই লাদাখের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। ইতোপূর্বে দু’পক্ষের আলোচনায় নিয়ন্ত্রণরেখা মেনে চলার ব্যাপারে যে ঐকমত্য হয়েছিল, চীন তা লঙ্ঘন করেছে। এ সংঘর্ষের জন্য চীনও অবশ্য  পাল্টা ভারতকে দায়ী করে।

লাদাখ সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনা শুরু হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৬৭ সালে সিকিমের নাথু লা এবং চো লা এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অনুপ্রবেশকারী লাল ফৌজকে বিতাড়িত করেছিল ভারতীয় সেনারা। ১৯৭৫ সালে অরুণাচল প্রদেশের টুলুং লা এলাকায় আসাম রাইফেলস এর টহল বাহিনীর চার জওয়ানকে খুন করেছিল চীনা সেনারা।

লাদাখে গত মে মাস থেকে চলছে উত্তেজনা। দারবুক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি বিমান বাহিনী (বায়ুসেনা) ঘাঁটি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণরেখার সমান্তরালে ভারত ১৬ হাজার ৬১৪ ফুট উচ্চতায় বিশ্বের সর্বোচ্চ যে রাস্তা তৈরি করছে, মূলত তা নিয়েই আপত্তি চীনের। কারাকোরাম পাসের কাছে সিয়াচেন হিমবাহ পর্যন্ত এই রাস্তা গেছে গালওয়ান উপত্যকা হয়ে। পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৪-তে শাইয়োক নদীর ওপরে সেতু তৈরি ঠেকাতে ওই সময় পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা, নাকু লা এবং প্যাংগং লেকের উত্তর প্রান্তে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ভারতীয় এলাকার কয়েক কিলোমিটার ভিতরে এসে তাঁবু গাড়ে চীনা বাহিনী। এর পর থেকে প্রায়ই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত হচ্ছে। পররাষ্ট্র পর্যায়ে দু’দেশের বৈঠক এবং সর্বশেষ গত ১০ জুন ডিভিশনাল কমান্ডারদের নিয়ে দু’দেশের সেনাদের বৈঠকও থামাতে পারেনি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

তবে আশার আলো এখনও নিভে যায়নি। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে মতবিরোধ দূর করতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ভারত। তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো রকম আপসের পথে হাঁটবে না বলেও জানানো হয়েছে দেশটির পক্ষ থেকে। এদিকে  সীমান্ত উত্তেজনা বন্ধে ভারতকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বানও জানিয়েছে চীন। বলতে গেলে চীনের একমাত্র বন্ধুদেশ হচ্ছে পাকিস্তান। অপরদিকে ১৯৯৯-২০০০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ জোরদার হয়েছে।

চীন ও ভারত উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রে এখন সমৃদ্ধ। দুই দেশের সংঘাতে নিজেদের ক্ষতি ছাড়াও প্রতিবেশি দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি ভারত ও চীনের মধ্যে যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী। সীমান্তযুদ্ধ চলমান থাকলে শুধু লাদাখ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের কাছাকাছি অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে। তাই এই সংঘর্ষ সামরিক শক্তি দিয়ে নয় বরং আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

লেখক:

তপন চক্রবর্তী, ডেপুটি এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম