কৈশোরকালীন চাহিদায় মনো-সামাজিক যত্ন এবং জীবন দক্ষতা শিক্ষা

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনঃ

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। কৈশোরকালীন সময়ে একজন কিশোর বা কিশোরীর জীবনে মানসিক, শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন ঘটে। এই বয়সের ছেলে-মেয়ে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরও স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি থাকে।

প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক ও সামাজিক ইত্যাদির মতো বিষয়ে তারা অবগত নন। এ সময় কিছুটা মানসিক টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। কিশোররা এ সময় নিজেকে স্বাধীন ভাবে, বাবা-মায়ের খবরদারি পছন্দ করে না। নিজে নিজে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে চায় এবং কখনও বাবা-মায়ের সঙ্গে রূঢ় আচরণও করে। হরমোনের পরিবর্তনসহ মানসিক বিকাশের পর্যায় অতিক্রম করতে করতে আবেগের ঝড় বয়ে যায় তাদের মনে। নিজের শারীরিক আর মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশও বদলাতে থাকে। নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে তারা এ বয়সে জানতে শুরু করে এবং শৈশবের ধারণার সঙ্গে তা না মিললে মনের মধ্যে জন্ম নেয় দ্বন্ধ। নিজেদের শারীরিক পরিবর্তনও কিশোর-কিশোরীকে কিছুটা অন্তর্মুখী করে তোলে। এ সময়টিতে একজন কিশোর বা কিশোরী শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি তার জ্ঞান, মনোসামাজিক আর নৈতিকতা বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো অতিক্রম করে। এ সময় মনের যত্ন নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

কৈশোরকালীন যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়, সেই বিষয়টি সম্পর্কে শুধু জানলেই হবে না, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সঠিকভাবে বুঝতে পারলেই কেবল তাদেরকে খাপ-খাওয়ানোর ব্যাপারে সাহায্য করা সম্ভব হবে। এই অবস্থা বোঝার সহজ ও কার্যকর উপায় হল, কৈশোরকালে নিজেরা কি ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা অর্থাৎ ঐ সময়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা মনে করার চেষ্টা করা। নিজেদের কৈশোরকালীন অবস্থার সাথে কিশোর-কিশোরীদের অবস্থাকে মেলানোর চেষ্টা করলে তাদের অবস্থা বোঝা সহজ হয় এবং এক ধরনের সহমর্মিতা গড়ে উঠে।

এ ছাড়া এই বয়সীদের পর্যবেক্ষণ করে, এই বয়সের সাধারণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গড়ে বা অন্যান্যদের থেকে জেনে নিয়েও এই বয়সীদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের অবস্থা শুধু বুঝলেই হবে না বরং তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই স্বীকৃতি দেবার ব্যাপারটি বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে হতে হবে। যেমন কাজ করা অথবা কাজ করার দায়িত্ব নেবার ইচ্ছাকে প্রশংসা করা। এই সময় তারা তার পরিবারের ব্যাপারে যদি কোন দায়িত্ব নিতে চায় বা কোন ধরনের কাজ করে তবে তাঁকে বাধা না দিয়ে বরং যথেষ্ট প্রশংসা করতে হবে। ঠিকমত করতে না পারলেও তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং সাহায্য করতে হবে। এর ফলে সে নিজেকে পরিবারের একজন বলে মনে করবে যা পরিবারের অন্যান্যদের সাথে সহযোগিতা করার মনোভাব বাড়বে।

বর্তমান এই কভিড পেন্ডামিক সময়ে পরিবারের বিভিন্ন বিষয় যেমন সাজান গোছানোর কাজ, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ প্রভৃতি ব্যাপারে পরিবারের সবার সাথে বসে আলাপ আলোচনা করার সময় কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে নিতে হবে। তাদের মত প্রকাশের সুযোগ নিতে হবে। শুধু মত প্রকাশের সুযোগই নয় বরং যেসব ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে গ্রহণ করা যায় সেক্ষেত্রে তা গ্রহন করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে পুরোপুরি গ্রহন করা সম্ভব না হলে আলোচনা করে কিছুটা হলেও তাদের মত গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়েটি নিজেকে পরিবারের একজন বলে মনে করবে। এই বয়সে নিজস্ব সত্তার বিকাশ হয় বলে কিশোর-কিশোরীরা মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকে।

এই অবস্থার উন্নতির জন্য তাদেরকে সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত করা প্রয়োজন। সৃজনশীল অনেক কাজই করতে পারে যেমন, ছবি আঁকা, খেলনা বানানোর কাজ যা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক দ্বন্দ্বের উন্নতি ঘটাবে। অন্যান্যদের চোখে কিশোর- কিশোরীদের গ্রহনযোগ্য করবে, আবার ভাল কাজের মাধ্যমে তাদের গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে যা নিজস্ব সত্তাকে খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।

জীবন চলার পথে বিভিন্ন ঝুঁকি বা বিপদকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করে জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য যে শিক্ষা-তাকেই জীবনদক্ষতা শিক্ষা (Life Skills Based Education, LSBE) বলে। এক্ষেত্রে, জীবনদক্ষতা-শিক্ষা সুষ্টু ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। জীবনদক্ষতা হচ্ছে এমন কতগুলো মনো-সামাজিক দক্ষতার সমষ্টি যা মানুষকে সমস্যার মোকাবেলা করতে, যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে এবং জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণকর করতে সহযোগিতা করে। এবার আসা যাক আমরা জীবন দক্ষতার উপাদানসমূহ নিয়ে আলোচনা করি।

১০টি জীবনদক্ষতা
১. সমস্যার সমাধান
কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে সমস্যাটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা, সমস্যার কারণ খোঁজা এবং সমাধান করতে পারার দক্ষতা অর্জন করা দরকার। সমস্যার সমাধান না করে তা এড়িয়ে চললে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, যার প্রভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

২. সিদ্ধান্ত গ্রহণ
লক্ষ্যে পৌঁছানো বা কোনো বিষয়ে কিছু ঠিক করা বা মনস্থির করা মানে সিদ্ধান্ত নেয়া। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একই বিষয়ে অনেকগুলো বিকল্প পন্থা চিন্তা করা প্রয়োজন। ভালো ও মন্দ চিন্তা করে যে সিদ্ধান্তের ভালো দিক বেশি, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারা এবং জীবনের বিভিন্ন স্পর্শকতার বিষয়ে কী করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেই দক্ষতা অর্জন করা দরকার।

৩. গভীরভাবে চিন্তা/বিশ্লেষনাত্মক চিন্তা
গভীরভাবে বা ভেঙ্গে ভেঙ্গে বা বিশ্লেষনাত্মক চিন্তা হলো, কোনো বিষয়কে যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে দেখে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বিশ্লেষনাত্মক চিন্তা -ভাবনা হলো এমন একটি দক্ষতা, যার মাধ্যমে যে কোনো বিষয়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে সাহায্য করে। এই দক্ষতা সমস্যার কারণ খুঁজতে এবং তার সমাধান পেতে সাহায্য করে।

৪. নতুন নতুন চিন্তা বা সৃজনশীল চিন্তা
নতুন চিন্তা বা সৃজনশীল বা সৃষ্টিশীল চিন্তা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে, সমস্যা সমাধান করার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে এবং এর ফলাফল চিন্তা করতে বা সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা করতে সাহায্য করে। সৃষ্টিশীল চিন্তা চেতনা সমস্যা সমাধানে বিকল্প বা ভিন্ন পথ খুঁজতে সাহায্য করে।

৫. সঠিক ও কার্যকর যোগাযোগ
নিজের চিন্তা ভাবনা, ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয়গুলো অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে প্রকাশ করতে পারাই হলো কার্যকর যোগাযোগ। কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধ রেখে তার কথাও সমা গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। এই দক্ষতা অন্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে এবং তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। একে অন্যের সাহায্য ও সহযোগিতা পাওয়ার জন্যও এই দক্ষতা প্রয়োজন। যোগাযোগ-দক্ষতা মানুষের একটি বিশেষ দক্ষতা, যে দক্ষতা দ্বারা সহজেই সমস্যা সমাধান করা যায়। যোগাযোগ-দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানুষকে আরো অনেক দক্ষতা অর্জন করতে হয়। যেমন-শ্রবণদক্ষতা, কথা বলার দক্ষতা, লেখার দক্ষতা, ফিডব্যাক দেয়া-নেয়ার দক্ষতা ইত্যাদি। সঠিক যোগাযোগের জন্য শ্রবণ দক্ষতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই শ্রবণদক্ষতা বলতে বোঝায়, অন্যের ভাষাকে বুঝতে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা এবং যুক্তিসঙ্গত হলে নিজের মনোভাবকে পরিহার করে তা গ্রহণ করা।

৬. অন্যের সাথে সম্পর্ক বা আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক
এক ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যক্তির সম্পর্ক হলো আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্র্ক। এই দক্ষতা আমাদের অন্যের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে এবং বজায় রাখতে সাহায্য করে। যা আমাদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার জন্য খুবই দরকার। এর অর্থ পরিবারের সদস্যদের সাথে, বন্ধু-বান্ধবের সাথে এবং সমাজের মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা। একে অন্যের সাহয্য ও সহযোগিতা পাবার জন্য এই ধরনের সম্পর্ক প্রয়োজন।

অন্যের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশল:
 মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা ;
 নাম ধরে ডাকা, বন্ধু ভাবা, যেভাবে পছন্দ করে (বয়সে বড় হলে ভাই, আপা, চাচা, মামা, খালা, ফুপু বলে ডাকা);
 আগ্রহ সহকারে কথা বলা ও প্রশংসা করা;
 অন্যের স্থানে নিজেকে ও তার কাজকে নিয়ে ভাবা’
 সেবা দিতে চেষ্টা করা।

৭. নিজেকে জানা বা আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস
নিজের সম্পর্ক জানতে হলে, প্রথমেই নিজেকে জানার চেষ্টা করতে হবে এবং নিজের মধ্যে কী কী সবল ও দুর্বল দিক আছে, সে সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে। তারপর গভীরভাবে চিন্তা করে দেখতে হবে, নিজের অবস্থা কী, কী করা প্রয়োজন, কী করলে নিজের জীবনকে সুন্দর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যায়। নিজেকে জানা অর্থাৎ নিজের চরিত্রের ভালো দিক, নিজের বিশ্বাস, নিজের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে জানাকেই ‘নিজেকে জানা’ বা আত্মসচেতনতা বোঝায়। যখন আমরা কোনো মানসিক চাপের মধ্যে থাকি তখন আত্মসচেতনতা আমাদেরকে সেই চাপগুলোকে চিনতে এবং তা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে। এছাড়া আত্মসচেতনতা কার্যকর যোগাযোগ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক তৈরিতে সহাযতা করে। পাশাপাশি আত্মসচেতনতা অন্যের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করতেও সহায়তা করে।

৮. অন্যের অবস্থানে নিজেকে ভাবা বা সহমর্মিতা
সহমর্মিতা হলো সেই দক্ষতা যার মাধ্যমে নিজেকে অন্যের অবস্থানে চিন্তা করে তার পরিস্থিতি তার মত করে বুঝতে পারা। এই দক্ষতা মানুষকে অন্যের জন্য সেবামূলক আচরণ করতে, সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে এবং ধৈর্যশীল হতে সাহায্য করে। কেউ কেউ একে সহানুভূতিও বলে থাকে।

৯. আবেগ প্রশমন/মানসিক চাপে টিকা থাকা
চাপের মুখে কী করে স্থির থাকা যায়, ভেঙ্গে না পড়ে সঠিক সিদ্ধানমশ নেয়া যায় সেই কৌশল শেখা। আবেগ প্রশমনের দক্ষতা অর্জন করতে পারলে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে নিজেকে বিপদ মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা সম্ভব হয়। আবেগ প্রশমন না করতে পেরে অনেকে ঝগড়া-মারামারি করে, অনেক সময় আত্মহত্যাও করে।

১০. সমঝোতা ও ‘না’ বলতে পারা
আলোচনার মাধ্যমে একই মতামতে বা সিদ্ধান্তে পৌছার দক্ষতাই হলো সমঝোতা। এই দক্ষতার মাধ্যমে কোনো বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে ‘না’ বলতে পারার ক্ষমতা গড়ে তোলা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ‘না বলার দক্ষতা কাজে লাগানো প্রয়োজন।
 মাদকদ্রব্য গ্রহণে ‘না’ বলা;
 যৌন উত্তেনামূলক অশ্লীল কর্মকান্ডে (অশ্লীল ছবি দেখা, বইপড়া, দৈহিক সম্পর্ক গড়া ইত্যাদি) ‘না’ বলা;
 চুরি-ছিনতাই, অপহরণসহ অসামাজিক কর্মকান্ডে ‘না’ বলা।

সারা পৃথিবী একটি অসুন্দরতম সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক যুগে আমরা কখনোই ভাবিনি আমাদের সন্তানরা বিশেষ করে কৈশোরকালীন সময়ের ভেতর দিয়ে যাদের জীবন প্রবাহিত হয় তারা এত বেশী সময় ধরে নতুন একটি জীবন পার করবে। মা-বাবা কিংবা অভিভাবক হিসেবে, বর্তমান সময়ে, পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় সন্তানদেরকে অধিক সময় দেয়ার মাধ্যমে কিশোর কিশোরীদের জীবন দক্ষতা অর্জনের উপাদান সমূহ অর্জনে সফলতা আনতে পারব এই বিশ্বাস আমার সবসময়ের। আনন্দময় নিরাপদ কৈশোর হউক সেটাই আমাদের চাওয়া।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি তৈরী করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত শিশু মনোবিজ্ঞান, এনসিটিবি প্রকাশিত বই, হাসাব প্রণীত জীবন দক্ষতা সহায়িকা, যুব উন্নয়ন প্রকাশিত সহায়িকা, EPS Fire Prevention, Tonny Mathew, Youth Peer Network , The daily Star, BBC Bangla ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রকাশনার সহায়তা নেয়া হয়েছে।

লেখকঃ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
উন্নয়ন কর্মী