প্রকৃতির মানুষ তথা প্রকৃত মানুষ

 

মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন:
সৌরজগতের আবিস্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যে এখনো পর্যন্ত পৃথিবী নামক গ্রহে জীবের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবী নামক গ্রহের সৃষ্ঠি আজ থেকে প্রায় ৪.৫৪ক্ট০.০৫ বিলিয়ন বছর, উক্ত গ্রহে প্রানের উদ্ভব প্রায় ৩.৫৫ বিলিয়ন বছর এবং মানুষ নামক প্রানীর সঞ্চার মাত্র আজ থেকে মাত্র ২,০০০০০ বছর আগে। যাকে বিজ্ঞানীরা আধুনিক মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পৃথিবীতে জানা অজানা, আবিস্কৃত-অনাবিষ্কৃত, গনিত-অগনিত, নামধারী-বেনামধারী, পরিচিত-অপরিচিত, শান্ত-হিং¯্র, বন্য-পোষ্য, উপকারী-অপকারী, জলে স্থলে আকাশে বিদ্যমান বিচিত্র লক্ষকোটি জীবের মধ্যে একমাত্র জীব মানুষকে করা হয়েছে শ্রেষ্ঠ গুনাবলী সম্পন্ন, বোধশক্তি সম্পন্ন, চেতনাশক্তি সম্পন্ন,আবেগ অনুভুতিকে ভাষায় প্রকাশ করতে সক্ষম জীব যাকে ইসলামের ভাষায় বলা হয়ে থাকে আশরাফুল মাখলুকাত। আরবীতে ইনসান, ইংরেজিতে যঁসধহ, ফ্রান্স ভাষায় যঁসধরহব, গ্রীক ভাষায় ανθρώπινη জার্মান ভাষায় সবহংপযষরপযবহ এবং বাংলা ভাষায় মানুষ। পৃথিবীতে মানুষ নিয়ে গবেষনা করছে নানা বিজ্ঞান তন্মধ্যে সাধারন বিজ্ঞান, ধর্মতত্ব(ঃযবড়ষড়মু), সমাজবিজ্ঞান(ংড়পরড়ষড়মু), জনসংখাতত্ব(ফবসড়মৎধঢ়যরপ), মনোবিজ্ঞান(ঢ়ংুপযড়ষড়মু), নরবিজ্ঞান(ধহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু), সহ বিজ্ঞানের আরো অনেক অনেক শাখা রয়েছে। মানুষকে সর্বত্র সকল ভাষায়, সকল ধর্মে, সকল তত্বে এক নামে পরিচিত করার সুবিধার্থে তাকে বৈজ্ঞানিক নামকরন করা হয়েছে ঐড়সড় ংবঢ়রবহং নামে। সুইডিস বিজ্ঞানী কেরোলাসলিনিয়াসমানুষ(যঁসধহ নবরহম) কে ধহরসধষরধ রাজ্য,পযড়ৎফধঃধ বর্গ, সধসধষরধ শ্রেনী, ঢ়ৎরসধঃবং ক্রম, যড়সরহরফধব পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করে যড়সড় জাত এবং ংবঢ়রবহং প্রজাতি হিসেবে নামকরন করেছেন।
মানুষকে এমনকিছু মনুষ্য গুনাবলী দ্বারা আবৃত করে রাখা হয়েছে যে গুনাবলী বা শর্তাবলী পশুপ্রানী থেকে মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে প্রমান করবে যে সে মানুষ, প্রকাশ করবে মানুষের অস্তিত্ব । এমন কতগুলি বৈশিষ্ট মানুষ ধারন করবে যা উত্তরাধিকারীসুত্রে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষ বহন করবে এবং লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি, দ্বারা কোনপ্রকার পরিবর্তন হবে না। মানুষ আকাঙ্খা পোষন করবে এবং তা পূরনের চেষ্টা করবে। মানুষের মানসিক বৃদ্ধি ঘটবে, চেতনা থাকবে, বিচারজ্ঞান থাকবে, চিন্তাক্ষমতাসম্পন্ন হবে এবং তার মনের আবেগ অনুভুতিকে বোধগম্য করতে সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। এই হলো পশুপ্রানি থেকে মানুষের কিছু মৌলিক পার্থক্য।
মানুষ জন্মের পর থেকে সে তার একটি পরিচিতি পায়, তার একটি নাম থাকে, একজন বাবা থাকে, একজন মা থাকেন। সমাজে শিশুটি বেড়ে উঠার মাধ্যমে কিছু শিক্ষা গ্রহন করে থাকে। সমাজবদ্ধজীব হিসেবে মানুষের বৈশিষ্টগুলো ধারন করতে থাকে। যদি সে জঙ্গলে বেড়ে উঠে সে পশুপাখির ন্যায় চালচলন করতে শিখে যাকে আমরা টারজান বলে জানি। সমাজের অভাবে টারজান তার মানসিক বৈশিষ্টাবলী থেকে বঞ্চিত হয়, বায়োলজিক্যালি মানুষ হয়ে ও প্রকৃত মানুষ হতে ব্যার্থ হয়। সমাজে যারা বড় হয়ে থাকে তারা এক পর্যাায়ে কেউ লেখাপড়া শিখার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করে থাকে, নিজেকে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত করার চেষ্ঠা করে থাকে। কেউবা কোনপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বড়মাপের মানুষ হয়ে পৃথিবীতে সুনামধন্য হয়ে থাকেন, জগতে কীর্তিমান হয়ে মৃত্যুবরন করে থাকেন। তবে আমরা ধরেই নেই যে প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন। পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ার ভিত্তি স্থাপন করে থাকি। পাশাপাশি মনকে গড়ে তুলতে নানাভাবে নানারুপে আশ্রয় নিয়ে থাকি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপর। নিজেকে জড়িয়ে নেই নানা ধর্মের উপর, কেউ ধ্যান-জ্ঞান, কেউ বাদ্য-বাজনা, কেউ সাধু কেউ গায়ক কেউ বাউল কেউবা সন্নাসি হয়ে মনের প্রশান্তি আনয়নের চেষ্ঠা করে কাটিয়ে দেই সারাটি জীবন।
শিক্ষা হলো, প্রশান্তি মিললো এখন দরকার তার বিস্তৃতি। নিজেকে বিস্তৃত করতে নানামুখি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকি। ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে গড়ে তুলার জন্য নিজেকে সাধারন থেকে অসাধারন হওয়ার প্রয়াসে লিপ্ত হই। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিল্পী, গীতিকার-নাট্যকার, কিংবা নিজেকে কোন বিষয়ে পারদর্শী করতে বিদ হওয়ার প্রানান্ত চেষ্ঠা করে আত্মপ্রকাশ করি অর্থনীতিবিদ, নৃতত্ববিদ, গণিতবিদ, প্রকৃতিবিদ, সমাজবিদ কিংবা রাজনীতিবিদ হয়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ করার চেষ্ঠা করে থাকি। নিজেকে ব্যতিক্রমধর্মী করে গড়ে তুলার মূল উদ্দেশ্য নিজেকে অমর করে তুলা, নিজেকে কর্মের মাধ্যমে অন্যের মাঝে বাঁচিয়ে রাখা। নিজেকে নিজের গন্ডী থেকে বের করে সীমা ছাড়িয়ে অসীম করে রাখার প্রত্যয়।
সুনাম, যশ, খ্যাতির গন্তব্য পাওয়া গেলেও আজও সুখের সীমা নির্ধারন করতে ব্যার্থ হয়েছি আমরা। নিজেকে সুখি করতে হবে। কিন্তুু কতটুকু সুখী করতে হবে তা কেউ জানে না। সুখের সংজ্ঞা নির্ধারন করতে পারছি না কেউ। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতো করে সুখকে সঙ্ঘায়িত করে যাচ্ছি। নিজের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া উঠছি আমরা। জগতের মোহে এতোটাই অন্ধ হয়ে আছি যে অন্ধত্ব আমাকে আমার কৌলিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে রুপান্তরিত করে ফেলছে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় হাত পা, নাক, মুখ, নাক, কান, গলা, উদর সহ একটি সোজা খাড়া শারিরিক গঠন সম্পন্ন প্রানির চিন্তাশক্তি, বাকশক্তি, বোধশক্তি থাকলেই মানুষ যড়সড় ংবঢ়রবহং. তাহলে আমরা কী শুধ্ইু মানুষ নাকি প্রকৃতপক্ষে মানুষ তা যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন কিছু বিষয়ের সার্বজনীন সংজ্ঞা। সুন্দর-অসুন্দর, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ভালো-মন্দ, চাহিদা-অভাব, প্রাপ্তি-ঘাটতি, এসমস্ত গুনবাচক শব্দগুলোর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দরকার, দরকার নিরপেক্ষ সংজ্ঞা। আমার কাছে যা অসুন্দর, দুঃখ, বেদনা, ঘাটতি, চাহিদা, তা অন্যের কাছে হতে পারে সুন্দর, সুখ, আনন্দ, প্রাপ্তি। পরিবেশ পরিস্থিতি সময়ের সাথে সাথে বিষয়গুলো রূপ বদলায়। আজ ফিলিস্থিনির কাছে যা বেদনা ইসরাইলের কাছে তা আনন্দ, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য যা প্রাপ্তি এশিয়ার কাছে তা ঘাটতি। খুনির কাছে খুন যেমন তার উপার্জন তেমনি খুন হওয়া পরিবারের জন্য তা অপূরনীয় ক্ষতি। পিশাচের কাছে ধর্ষণ আনন্দের হলেও ধর্ষিতার জন্য তা সতিত্ব হারানোর আর্তনাদ। বিবেচ্য বিষয় বস্তুুত মনের এবং পরিবেশের অবস্থা। প্রকৃতপক্ষে সুখ, আনন্দ, ঘাটতি, চাহিদা, প্রাপ্তি, বেদনা, লাভ-ক্ষতিকে সার্বজনীন সংজ্ঞায়িত করতে গেলে প্রথমেই বিবেচনায় রাখা দরকার স্বার্থ ও উদ্দেশ্য। অন্যের সার্থে কোনপ্রকার বিচ্যুতি না ঘটিয়ে কোন প্রকার অসৎ অভিপ্রায় পোষন না করে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি ঘটাতে পারলেই তবে তা হতে পারে সার্বজনীন ।
আজ প্রকৃত মানুষের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। পৃথিবি এগিয়ে চলছে, দুরত্ব কমিয়ে ছোট করে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা হচ্ছে গোটা গ্রহকে, শারিরিক শ্রম কমিয়ে সহজসাধ্য করা হচ্ছে সকলপ্রকার কার্যক্রমকে, ক্যামেরা বন্দি করে ক্লোজ সার্কিটের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে পুরো বিশ্বকে, ভারীকে করা হচ্ছে হালকা, দূরবর্তীকে করা হয়েছে নিকটস্থ, চোখের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত করা হচ্ছে গোটা দুনিয়াকে। বারুদের স্থলে জীবাণু, ক্যাবলের স্থলে ব্যবহৃত হচ্ছে তরঙ্গ। কিন্তু পৃথিবী প্রকৃতপক্ষে কি পাচ্ছে, আমি তুমি আমরা কি পাচ্ছি? ঘৃণা, পাপ, অভিশাপ আর রক্তের হুলি খেলায় বলী হচ্ছি আমরা সবাই। প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক শিক্ষা কি আমাদেরকে এই শিখিয়ে আসছে যুগ থেকে যুগান্তর শতাব্দি থেকে শতাব্দি অব্দি? সকল আধুনিকতা, সকল সভ্যতার আশির্বাদে আমরা নিজেদের মৌলিক মুল্যবোধ থেকে ছিটকে ফেলে মানুষ থেকে পশুতে রুপান্তরিত করে ফেলছি মনের অজান্তে।
পৃথিবীতে প্রায় চারহাজার দুইশত ধর্মের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ভাষা রয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজারের ও উপর। সকল ধর্মের একই মন্ত্র, একই বাণী। সদা সত্য কথা বলিবে, জীব হত্যা মহাপাপ, গুরুজনে শ্রদ্ধা করো, এতিমে দয়া করো, পাপকর্ম থেকে বিরত থাকো সকল ধর্মেই প্রচলিত। একইভাবে সকল ভাষারও রয়েছে একই উদ্দেশ্য- সঠিক যোগাযোগ, মনের ভাব অনুভুতি আবেগ প্রকাশ করাই হচ্ছে ভাষার মূল কাজ। দেশ জাতি ধর্ম বর্ন সংস্কৃতি অনুযায়ী শব্দের উৎপত্তির তারতম্য রয়েছে বটে। বাংলা ভাষায় ঢেঁকি শব্দের প্রচলন থাকলেও ফরাসি ভাষায় এর প্রচলন পরিলক্ষিত হয় না। তবে সুন্দর, ভালো, নীতিকর, গর্হিত, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, পাপ-পূন্য শব্দগুলোর পরিশব্দ সকল ভাষাতেই পাওয়া যাবে। সকল ভাষাভাষী জনগোস্টিই এই জাতীয় শব্দগুলোর ব্যবহার করে থাকে। যদি সকল ধর্মে, সকল বর্নে, সকল ভাষার মাঝে এই বিষয়সমূহের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে তবে কেন আমাদের মাঝে মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ, প্রকৃত ভালো মানুষ হতে কিসে এতো বাধা, কেন এত সংকট।
সকল সমাজ, সকল রাষ্ট্র, সকল ধর্ম, বর্ন, গোত্র, সকল গ্রন্থ, সকল বিধান-সংবিধানে, সকল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষনাগার, সকল মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডার উদ্দেশ্য যদি একই হয়ে থাকে নিজেকে, অন্যকে, পরস্পরকে প্রকৃত ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, তবে কেনো আমরা এতো বর্বর, কেন এতো পৈশাচিক, কেনো এতো নির্মম-নিষ্ঠুর, কেন এতো হিং¯্র-নৃশংস-রক্তপিপাসু। আমরা নিজেদেরকে কেন এতো নির্দয়, অসভ্য, অসংস্কৃত, পাপাচারি, দূষিত, কলুষিত করে ফেলি, কেন হয়ে যাই এতো পাশবিক-ক্রুর। কেন পারি না মানুষ থেকে প্রকৃত ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে।
পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রায় সকল কিছুকেই পরিমাপের জন্য আবিস্কার করা হয়েছে নানা মাপক বা মানদন্ড। যা দিয়ে খুব সহজেই আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সকল কিছুর মাত্রা বা দক্ষতা পরিমাপ করে থাকি। পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা শিক্ষা অর্জনের পর পাশ-ফেল নির্ধারণ করে থাকি তেমনি দরিদ্রসীমা দিয়ে ধনী-গরীব, জিডিপি দিয়ে জীবনযাত্রার মান, ব্রেথালাইজার দিয়ে অ্যালকোহল আসক্তি, অয়েট স্কেল দিয়ে শরীরের ওজন, থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা, স্টেথোস্কোপ দিয়ে হৃদস্পন্দন কিংবা স্ফিংগমোম্যানোমিটার দিয়ে যদি বøাড প্রেসার মাপার ব্যবস্থা থাকে তবে সমাজে ভালো মানুষ যাচাইয়ের জন্য আমরা কি মিটার আবিস্কার করেছি। কি দিয়ে পরিমাপ করবো আমরা কতটুকু প্রকৃত ভালো মানুষ। একগুচ্ছ দোষ-গুন, দৃষ্টিভঙ্গি, চালচলন, বাচন-ভঙ্গি আর আচার-আচরণকে সূচক ধরে আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ ভাষায় আপেক্ষিকভাবে বিচার করে থাকি। তাই সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে জাতি ধর্ম বর্ন গোত্র রাষ্ট্র সরকার দেশ মহাদেশ কৃষœাঙ্গ স্বেতাঙ্গ সকল ভেদাভেদ ভুলে নতুন এক অস্তিত্বের সার্বজনীন রুপে রুপায়িত করে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে একজন ভালো মানুষ হিসেবে।
নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কিছু বিষয় আমাদের প্রতিনিয়ত চর্চার প্রয়োজন, প্রয়োজন কিছু গুনাবলী অর্জনের-
সবসময় নিজেকে পজিটিব ভাবুন- নেতিবাচক চিন্তাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সর্বদা ইতিবাচক ভাবনা ভাবুন। অসম্ভব বলতে কিছু নেই, চেষ্টা করলে সকল কিছু করা সম্ভব, দরকার শুধু আপনার ইচ্ছা শক্তি, উদ্যম আর পরিকল্পনা।
নিজের নেতিবাচক বৈশিষ্ঠগুলো বিবেচনায় রেখে কাজ করুন। প্রথমত নিজের দূর্বল দিকসমুহ যেমন আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব, স্বার্থপরতা, শুদ্ধতা, জটিলতা, রুক্ষতা, রুঢ়তা, কুমন্ত্রনা, চিহ্নিত করুন এবং ধীরে ধীরে একটি একটি করে পরিহার করুন। একদিন আপনিও হয়ে যাবেন একজন শুদ্ধ সাচ্চা খাটি মানুষ। ভালো গুনাবলী সম্পন্ন একজন আদর্শ ব্যাক্তিকে চিহ্নিত করুন, অনুসরন করতে থাকুন। তা হতে পারেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ), নিজের মনের ভিতরে এমন একজন আদর্শ ব্যাক্তির ছবি একে ফেলুন, ধরে নিন তিনি আপনার আদর্শ, এবার আপনি তাকে অনুসরন করতে থাকুন।
বেশী করে হাসুন, নিজের মনকে সবসময় প্রফুল্ল রাখার চেষ্ঠা করুন, হাসি মুখে কথা বলুন-হতে পারে সহকর্মী হতে পারে অপরচিত, হতে পারে রাস্তায় দেখা কোন আগন্তুক।
নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গড়ে তুলুন। প্রতিদিন স্বপ্রনোদিত হয়ে কমপক্ষে কিছুটা সময় স্বেচ্ছায় অন্যেও কাজে লাগান।একদিন উপভোগ করবেন স্বেচছাশ্রমের আনন্দ কতো মধুর। দাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন। কি দান করলেন তা বড় বিষয় নয়। খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ কিছুই সম্ভব না হলে কিছুটা ভালো সময় হলেও দান করুন যা অন্যকে কোন না কোন ভাবে সাহায্য করতে পারে। অন্যের জন্য কি করলেন তা নিয়ে ভাবুন, নিজে কি পেলেন তা বড় করে দেখবেন না।

ঘৃনার পরিবর্তে ভালোবাসা দিন। শ্রষ্ঠা সকল কিছুর মাঝেই কোন হিতকর বা মঙ্গল বিবেচনা করেই সৃষ্ঠি করেছেন। সুতরাং ঘৃনা নয় ভালোবাসা প্রকাশ করুন, হয়তবা দৃশ্যত ঘৃন্যবস্তুটির সৃষ্ঠির কারন আপনার আমার অজানা।
কৃত্তিমতা বর্জন করুন। ভাবুন কেউই শতভাগ পূর্ন নয়, আপনার যা আছে তাই প্রকাশ করুন, ঘাটতি থাকলে তা ও প্রকাশ করুন। তবু ও কৃত্তিমতা থেকে দূরে থাকুন।
আপনার সর্বোচ্চ আপনি করে যান। নিজেকে থেমে রাখবেন না, ভাবুন এ সমাজ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, এখানে আপনার অনেক কিছু করার আছে, নিজেকে বলুন সমাজে আপনি ই সর্বোচ্চ প্রদায়ক। আপনার সমাজে আপনি একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে যান। স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু খরিদ করুন, আপনিও তাদের একজন সদস্য তা তাকে বুঝতে দিন। দেশী জিনিস ব্যবহারে আগ্রহী হউন। বিদেশি পন্য বর্জন করুন।
জীবজন্তুর প্রতি সদয় হউন। যারা মাংসভোজী তারা প্রানীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন, ভাবুন আপনার ভোগের জন্য প্রানীটা জীবন দিয়ে গেছে। কাউকে ভালোবেসে কিছু প্রদান করুন। হয়তো যা দিচ্ছেন তা তার অধিকারে প্রাপ্র্য নয় । উপহার হিসেবে একটা কিছু প্রদান করুন যা আপনাকে মনে রাখতে সাহায্য করবে।
সুবিবেচক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন । সবাই সব জানে, সবাই সবকিছু করবে একথা সত্যি নয়। যিনি ভুল করেছেন ধরে নিন তিনি তার সর্বোচ্চ বিবেচেনা শক্তি দিয়েই করেছে হয়তো তা আপনার কাছে অগ্রহনযোগ্য বা অবিবেচকের ন্যায় মনে হয়েছে কিন্তু তার কাছে এটাই ঠিক, না হয় সে তা করতো না।
স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হউন। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। শারিরিক মানসিক সুসাস্থ্য ছাড়া আপনার কোন কাজেই মন বসবে না। তাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অধিক যতœবান হউন। চিন্তা ও জ্ঞানশক্তি বাড়ান। প্রচুর বই পড়–ন, স্টাডি করুন, অজানাকে জানার চেষ্ঠা করুন। নিজেকে তথ্যবহুল হিসেবে গড়ে তুলুন।

শালীন আচার আচরন প্রকাশ করুন, কাউকে দেখে শুভকামনা ও ইতিবাচক মনÍব্য করুন। দুঃখিত, ক্ষমা করবেন, দয়া করে, ধন্যবাদ, স্বাগতম প্রভৃতি শব্দগুলো ব্যবহার করুন। অপরের জন্য সিট ছেড়ে দিন। অপরকে সাহায্য করতে দরজা খুলে দিন, আগে সালাম দিন, শিশুদের ¯েœহ করুন। অন্যকে বুঝতে দিন যে আপনি তাকে কতটুকু ভালোবাসেন। বলুন যে আজ আপনাকে সুন্দর লাগছে, আপনার ড্রেসআপটা সুন্দর, আপনার ব্যাগটা আপনাকে ভালো মানিয়েছে, ইত্যাদি।
সকল কাজে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। ভালো একজন বন্ধু হিসেবে পরিচিত করে তুলুন। নিজের ভুল প্রকাশ করুন, জোর করে ভুলকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্ঠা করবেন না।
কঠোর পরিশ্রম করতে শিখুন, ভাবুন যারা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের কষ্টের কথা। নিজের প্রতি নিজের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করুন।
পরিবারে বাবা মায়ের সাথে দুরত্ব থাকলে তা কমাতে থাকুন, ভালোবাসতে থাকুন, নিজেকে বাবা মায়ের কাছে উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলুন। ভাই বোনের মাঝে নিজেকে উত্তম ভাই বোন হিসেবে, সন্তানের নিকট উত্তম বাবা মা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলোন। সুখে দুখের অংশীদারী হয়ে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন। জেনে রাখুন বাবা মা তাদের জীবনের অর্ধেক সময় আপনার পিছনে ব্যায় করেছেন সুতরাং আপনার উচিত তাদের জীবনের শেষ অংশটুকু আপনার সেবার মাধ্যমে ভালো রাখা।

ক্ষমাশীল হতে চেষ্ঠা করুন। যদি কারো প্রতি বিরক্ত বা ক্ষুব্দ হয়ে যান তবে তাকে সামনে থেকে চলে যেতে বলুন, নিজেকে শান্ত করুন, ভাবতে থাকুন ক্ষুব্ধতা বা আক্রোশের চেয়ে ক্ষমা অধিক উত্তম। আবেগ ভুলে ক্ষমাপ্রদর্শন করে তাকে তার প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ সৃষ্ঠি করে দিন।
বন্ধুমহলে নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে পরিচিত করুন। নিজের প্রয়োজনে বন্ধুদের সহযোগীতা নিন। আপনার নিকট কেউ কিছু চাইলে তা পুরণ করার চেষ্ঠা করুন, সময় চাইলে সময় দিন, পত্র দিলে জবাব দিন, ইমেইল করলে রিপলাই দিন, ফোন করলে তা রিসিভ করুন। ব্যাস্ততার কারনে টেলিফোন রিসিভ করতে না পারলে, সুযোগ মতো আপনি কল করে খোজ নিন কেননা আপনি হয়তো জানেন না কেউ আপনার কোন সহযোগীতা চেয়ে ফোনটি করেছিলো।

অন্যের আবেগ ও অনুভুতির সাথে একাত্ব হওয়ার চেষ্ঠা করুন। মনে রাখবেন আত্বনিবিষ্ঠ হওয়ার ক্ষমতা ছাড়া কোন সম্পর্ক তৈরি করা যায় না।
সর্বোচ্চ উৎকর্ষতার প্রতি লক্ষ্য স্থির করবেন। যা শুরু করবেন তার উত্তম সমাপ্তি আনয়নের চেষ্ঠা করুন। লক্ষ্য পরিবর্তন করুন, একই বিষয়ে সর্বদা লেগে না থেকে বিষয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্ঠা করুন। বাউন্ডারী অতিক্রমের চেস্টা করুন, নতুন কিছু সৃষ্ঠি করতে হলে আপনাকে সীমার বাধন ছিড়তে হবে। সর্বোচ্চ ভালো বস্তুুটি পাওয়ার আশা পোষন করুন যা আপনার সামর্থ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
যে কোন বিষয়ে বোধগম্য হউন অতঃপর নির্ণয়সাধ্য হওয়ার চেষ্ঠা করুন। কোন বিষয় শুনে বা পড়ে অন্ধের মতো গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন। নিজের অনুভুতি ও বোধশক্তি দিয়ে বিষয়টির যথার্থতা উপলব্দি ও নির্ণয়পূর্বক কাজটি গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন ভালো মন্দ বিচারের সর্বোচ্চ বিচারক আপনার নিজের বিবেক।
নিজেকে নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতিত্বহীন দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি করুন। অন্যের অগোচরে কারো সম্পর্কে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। সর্বদা বৈষম্যহীন মতামত প্রকাশ করুন। কাউকে বা কোন বিষয়ে আগাম নেতিবাচক ভবিষ্যৎবানী করা থেকে নিজেকে বিরত থাকুন। নিজের বিবেকের সাহায্যে সর্বদা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।
সত্যবাদী ও বিশ্বাসভাজন হওয়ার চেষ্ঠা করুন। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী কিছু করার প্রয়াস ব্যাক্ত করুন। কাউকে মিথ্যা আস্বাস দেওয়া পরিহার করুন। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে চেষ্টা করুন। নিজের অর্জন ও অন্যের প্রতিজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হউন।

নিজেকে পরিশ্রমী ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলুন। মনে রাখুন উন্নতির কোন শর্টকাট রাস্তা নেই, নিজেকে পরিশ্রম দিয়ে উন্নতির সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখার চেষ্ঠা করুন। জানার আগ্রহ শিখার আগ্রহ বৃদ্ধি করতে থাকুন। যা আপনার জানা আছে তা আরো সমৃদ্ধশালী করুন। নিজের অর্জিত জানা বিষয়ে প্রতিনিয়ত শান দিতে থাকুন, নিজেকে আরও দক্ষ করার চেষ্ঠা করুন।
নিজেকে অভিযোজনক্ষম, নমনীয় ও বহুমুখী করার চেষ্ঠা করুন। মনে রাখুন- কঠোরতা এক প্রকার অক্ষমতা। নিজেকে নমনীয় রাখুন, আপনাকে যে কোন পরিবেশে অভিযোজনে শক্তি ও সামর্থ্য যোগাবে।
রোমাঞ্চঅন্বেষী হয়ে যান। যা কখনো করেন নি তা করে ফেলুন, নিজেকে সাহসী ভাবুন, ঝুকিঁ নিতে শিখুন। মনে রাখুন জীবন মানেই ঝুকি, জীবন মানেই রোমাঞ্চ। নির্ভিকতা আর সাহসীকতার সাথে সকল কিছুর মুখোমুখি হয়ে যান। ভয় শঙ্কাকে সাহস দিয়ে, প্রত্যয় দিয়ে মোকাবেলা করুন।
অকপট ও মনখোলা হওয়ার চেষ্ঠা করুন। সর্বদা নিজেকে অমায়িক, স্পষ্টবাদী করে গড়ে তুলুন। মনের ভিতর যা পোষন করেন তা সুস্পষ্টভাবে নির্ভয়ে প্রকাশ করুন। জটিলভাবে প্রাপ্তির চেয়ে সরল আঘাত অনেক মধুর, মনে রাখুন-অস্পষ্ট ভালোবাসার চেয়ে সুস্পষ্ট ঘৃনা আনন্দের।
আগ্রহী হয়ে উঠুন। ভয়কে দূর করে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করুন। ভাবুন-জন্মেছিলেন শুধুমাত্র কিছু অনুভুতি চেতনা আর আকাঙ্খা নিয়ে এবং ফিরেও যাবেন চেতনা আর অনুভুতি নিয়ে। সুতরাং ভয়কে জয় করেনিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করুন, সকল কিছুতে আগ্রহ প্রকাশ করুন।
সততার অভ্যাস গড়ে তুলোন। জেনে রাখুন অসৎ হওয়া কেবল মুহূর্তের ব্যাপার যেখানে আপনাকে সৎ হতে হাজারো লোভ সংবরণ করতে হয়েছে। অসৎ জীবনের চেয়ে কয়েক মুহূর্তের সৎ জীবন উত্তম।
সুবিবেচক হতে চেষ্টা করুন। আপনার সিদ্ধান্তে আপনার কর্মে অন্যের স¦ার্থ ও মঙ্গল বিবেচনায় রাখুন। চিন্তা করুন আপনার সিদ্ধান্ত যেন অন্যের বিরাট ক্ষতির কারন হয়ে না দাড়ায়। সংকীর্ন চিন্তা ও নিভৃত্ততা পরিহার করুন। অন্যের কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিন। যদি কেউ আপনার সাহায্যপ্রার্থী হয় আপনি সহযোগীতার হাত প্রসারিত করে দিন।
”গোল্ডেন রোল” ও ”সিলভার রোল” অভ্যাস করুন। অন্যের প্রতি এমন ব্যবহার ও আচরন প্রদর্শন করুন, আপনি অন্যের প্রতি যেমনটি আশা করেন এবং নিজে এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন যেমনটি অন্যেরা করলে আপনি কষ্ট পেতেন। একটিমাত্র অভ্যাস আপনার জীবনধারাকে পাল্টে দিতে সক্ষম যদি আপনি নিয়মিত চর্চায় তা রপ্ত করে ফেলতে পারেন।

লেখক:

মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন,
অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি, ঢাকা।