টেকনাফ ছাত্রলীগে নয়া কমিটি করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার :

টেকনাফের মাদকের বড় বড় চালানসহ ধরা পড়ে জেলে যাওয়া এবং পরে জামিনে মুক্ত হয়ে ফের ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্তরা আবারও দলের নেতৃত্বে আসতে তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চাইছেন, পরিচ্ছন্ন ও ক্লিন ইমেজের নেতৃবৃন্দ টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের দায়িত্ব গ্রহণ করুক। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ইতোপূর্বে টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা নেতার কেউ কেউ ইয়াবার চালানসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে জেলে গেছে। তাদের পরিবারে অপরাপর সদস্য ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্ত রয়েছে জানা সত্ত্বেও উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক একাধিক কমিটি দিয়েছে। এতে ইয়াবা কারবার চাঙ্গা করে দুর্নাম রয়েছে ছাত্রলীগের। ওই দুর্নাম ঘোচাতে স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সম্মেলন হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে এখনও কমিটি ঘোষণা আসেনি।

সূত্র মতে, মাহমুদুল হক নামে ছাত্রলীগের এক নেতা এখনও কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছে। ২০১৮ সালের ৩১মে হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন ফাহিমকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব সদস্যরা। ২০১৯সালের ৫ ডিসেম্বর বিজিবি জওয়ানরা অভিযান চালিয়ে ইয়াবার চালানসহ হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব ফরহাদকে গ্রেফতার করে। ২০২০সালে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ টেকনাফ কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হককে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সে এখনও কারাগারে বন্দী।

সূত্র আরও জানায়, ইয়াবাসহ আটক ও কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে ছাত্রলীগের ওই নেতাদের কেউ কেউ ফের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূল ছাত্রলীগের কিছু কিছু নেতাকর্মী বলেন, সাইফুল ইসলাম মুন্না একটানা ৯ বছর ধরে টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকায় এবং তার হাতে দেয়া কমিটির নেতৃবৃন্দের অনেকে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে জেল খেটেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোন সদস্য দুই বারের বেশি একই পদে থাকতে পারে না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ২৩ বিধির (ক) উপবিধি অনুযায়ী কোন সদস্য বিয়ে করলে, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক পদে মোট দু’বার বহাল থাকলে পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী হবার অধিকার হারিয়ে ফেলবেন। অথচ সাইফুল ইসলাম মুন্না ২০১২ সাল থেকে এই পর্যন্ত ৪ বার মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ইয়াবা সিন্ডিকেটের নানান রকমের সহযোগিতা দেয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি এখন সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। টেকনাফের একাধিক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের দেয়া কমিটির নেতাকর্মীদের অনেকে ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার কারণে টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুল করিম ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন ফাহীম দু’জনই ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সাইফুল করিম ইয়াবাসহ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। এছাড়াও ২০১১ সালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইয়াবা সম্রাটদের তালিকায় ৭৪৯ নাম্বারে তালিকায় রয়েছে ছাত্রলীগের এই নেতার নাম। নুরুল আলম ফাহিমের বাবাও একজন ইয়াবার সিন্ডিকেটের গডফাদার ছিলেন। মাদক নির্মূলের অভিযানের সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তার পিতা। হ্নীলা ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন ফাহিম দায়িত্বে থাকাকালীন ইয়াবা নিয়ে র‌্যাব সদস্যদের হাতে গ্রেফতার হলে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুন্না তার নিজস্ব কর্মী বলে খ্যাত আবদুল মোতালেব ফরহাদকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনিও তার নিজস্ব কার্যালয়ে ইয়াবাসহ বিজিবির অভিযানে গ্রেফতার হয়। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, অনেকে পদপ্রার্থী হতে পারে, এতে বাধা নেই, তবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতা নির্বাচিত বা মনোনীত হবে।

এছাড়া ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাইফুল ইসলাম মুন্না বিএনপির হয়ে প্রচারণা চালায় বলে জানান স্থানীয়রা। ২০১৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। উল্লেখ্য ২০১৫ টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণের কয়েক বছর পর হয়ে গেলেও নতুন কোন কমিটি গঠন হয়নি। ২ ফেব্রুয়ারি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে কমিটি ঘোষণা না আসায় হতাশ হয়ে রয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের একজন নেতা বলেন, ইয়াবা সিন্ডিকেটের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত নেতা কিভাবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পদপ্রার্থী হয়? প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যেখানে মাদক নির্মূলের জন্য সর্বদা সোচ্চার, সেখানে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন উপজেলা টেকনাফে ইয়াবা কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা ছাত্রলীগ নেতৃত্ব পাওয়া হওয়া বেমানান। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা প্রেরণ সত্ত্বেও তিনি রিসিভ না করার তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।