ঘরের নয়, পরেরও নয়

মনজুরুল আহসান বুলবুল

১. একজন সাংবাদিক কতটা Professional আর কতটা Activist এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। গণমাধ্যম পন্ডিতরা এ নিয়ে কথা বলেছেন বিস্তর। সেই শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই বিতর্কের শুরু। আজও চলছে।

বরং নানা ব্যাখ্যায় এই বিতর্ক আরও জটিল হচ্ছে। এই বিতর্ক নিয়ে কথা বলতে হলে আলোচনার ক্ষেত্রটি বাড়াতে হবে।   খুঁজতে হবে সহজ এক প্রশ্নের জবাব।

সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের কাজ কী- এ প্রশ্নের জবাবে গণমাধ্যমের আদি পন্ডিতরা বলছেন, খুব বেশি নয় : ১. মানুষকে জানানো; ২. এই জানানোর মধ্য দিয়েই মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা; ৩. মানুষকে বিনোদন দেওয়া। এই তিনের মধ্যে বিতর্কের জায়গাটি লুকায়িত থাকলেও এই তিনের সঙ্গে পন্ডিতকে সক্রিয় করে তোলাটাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব। অনেকেই একমত হলেন; অনেকেই হলেন না; কিন্তু বিতর্কটি চলতেই থাকল। বরং লেজ হিসেবে আরেক বিতর্ক জুড়ল ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’। হামেশাই এই সবক শুনতে হয় নানা মহল থেকে।

 

 

 

কলার ঝাঁকিয়ে তারা বলেন, ‘দায়িত্বশীল’ সাংবাদিকতা করতে হবে। এই সবকের জবাব অতি স্পষ্ট : সাংবাদিকতা পেশাটিই দায়িত্বশীল, ‘অদায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ বলে কিছু নেই। সাংবাদিকতায় ভুল হতে পারে, ভুল স্বীকার করাটাও সাংবাদিকতার নান্দনিকতারই অংশ। কিন্তু দায়িত্বহীন কর্মকে সাংবাদিকতা বলা যাবে না বরং সেটি হবে অপ-সাংবাদিকতা। দায়িত্বশীলতা ও চ্যালেঞ্জ সাংবাদিকতায় হাত ধরাধরি করে চলে

চ্যালেঞ্জটি নানাকালে, নানা দেশে এমনকি নানা কর্মক্ষেত্রে নানারূপ নিয়ে হাজির হয় কিন্তু চ্যালেঞ্জবিহীন সাংবাদিকতা হতে পারে না। সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীলতার পোশাকি পরিচয় হচ্ছে ‘পেশাদারিত্ব’। এই পেশাদারিত্ব কীভাবে স্পষ্ট হয় তা সাংবাদিকতায় পড়ানো হয়, অভিজ্ঞ ও সফল পেশাদার সাংবাদিকরা বলেন, ‘সাংবাদিকরা কারও পক্ষে বলেন না, কারও বিপক্ষেও নয়, বলেন কেবল সত্যটা’। এই সত্যই কখনো কারও পক্ষে যায়, কখনো কারও বিপক্ষে। এই ‘সত্য’ কীভাবে নিরূপিত হয় সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়। সাংবাদিকতার পাঠকক্ষে এই সত্য নিরূপণের মাত্রাগুলো হাতে-কলমে শেখানো হয়।

২. এত অবতরণিকা করতে হলো নতুন প্রস্তাবনা তুলে ধরার জন্য। প্রস্তাবনাটি এই রকম যে, সাংবাদিকরা কি কোনো সংগঠনে যুক্ত হতে পারবেন? কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে? বা পেশাদারি সংগঠনে? পেশাদারি সাংবাদিকতার যতগুলো শর্ত আছে তার অন্যতম আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে : কোনো রিপোর্ট প্রকাশের বেলায় ঘটনার সঙ্গে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিক থাকা, ঘটনা বা বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া নয়। তবে মতামত দেওয়ার বেলায় অবশ্যই নিজস্ব দর্শন ও চিন্তার মত দেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে সেই পুরনো বিতর্কটি আবার এসে দাঁড়ায় : তাহলে কি সাংবাদিকরা কোনো রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী হতে পারবেন না? কোনো নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থী বা দলকে ভোটও দিতে পারবেন না? এ নিয়ে কথাবার্তা হলেও বিতর্ক দীর্ঘপথে এগোয়নি। কারণ একটি বিষয়ে গণমাধ্যমের তাত্ত্বিকরা একমত হয়েছেন : সাংবাদিকতা হচ্ছে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা।

আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা রাজনীতি বিবর্জিত হতে পারে না। সমাজ বা রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি যেহেতু রাজনীতি; কাজেই সাংবাদিকতা বা সাংবাদিকরা এই শক্তিবলয়ের বাইরে থাকতে পারেন না।

এই উপসংহারের একটি দৃশ্যমান রূপ দেখি মার্কিন গণমাধ্যম জগতে। সেখানে পুঁজি বিনিয়োগকারীদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে ভিত্তি ধরেই একেকটি গণমাধ্যমকে চিত্রিত করা হয়। চিহ্নিত করা হয় কোন সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলটি কোন রাজনৈতিক মতাদর্শকে ধারণ করে। কিন্তু সেই মালিকানা চরিত্র চিত্রণের কারণে গণমাধ্যমের কর্মীদের পেশাদারিত্ব বা সাংবাদিকতা গতি বা চরিত্র হারায় না। এমনকি একই বার্তাকক্ষে কর্মীদের নিজস্ব বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকার পরও। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে মূলধারার জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকমন্ডলী বড় দুই দল বা কখনো তৃতীয় উল্লেখযোগ্য শক্তির রাজনৈতিক ঘোষণা, মেনিফেস্টোর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, এবারের নির্বাচনে তারা কোন দলকে সমর্থন দেবেন। তবে এই সমর্থন ‘মৌলবাদী’ সমর্থন নয়। প্রতি নির্বাচনেই এটি বদল হতে পারে এবং এই সমর্থনটি শুধু নির্বাচনী প্রচারণা জনগণকে জানানো এবং তাদের শিক্ষিত করে তোলার জন্যই। নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গেই সঙ্গেই সাংবাদিকরা ফিরে যান ‘ওয়াচ ডগের’ ভূমিকায়। মজার বিষয় হচ্ছে, সম্পাদক পর্ষদ যখন এ সিদ্ধান্তটি নেন তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীই তা মেনে নেন, ভিন্ন দল বা প্রার্থীর প্রতি নিজের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি স্বাধীনভাবে নিজের ভোটও দিতে পারেন। আমাদের মতো আওয়ামী লীগের বিট করি বলেই আমি আওয়ামী লীগ বা আরেকজন বিএনপি বিট করেন বলেই তিনি বিএনপি এমনটি নয়। প্রকৃত পেশাদারিত্ব এরকম বিভাজনের সুযোগ দেয় না।

৩. বিষয়টি উপমহাদেশ বা বাংলাদেশের নিরিখেও আলোচনা হতে পারে। এই উপমহাদেশে যেহেতু সাংবাদিকতার শুরুটাই হয়েছে রাজনীতির হাত ধরে সে কারণে গণমাধ্যম বা গণমাধ্যমকর্মীরা রাজনীতি বিযুক্ত থাকতে পারেননি। আর এমন এককালে উপমহাদেশে সাংবাদিকতা শুরু হলো যখন এ প্রশ্নটিই সামনে এলো যে, যুদ্ধটি যখন স্বরাজের, লড়াইটি যখন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার তখন নিরপেক্ষতার কোনো সুযোগ কোথায়? এ নিরপেক্ষতা নিয়ে নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটুর চমৎকার বাণী হচ্ছে : বৃহৎ হাতির পায়ের নিচে যখন ক্ষুদ্র ইঁদুর চাপা পড়ে তখনকার নিরপেক্ষতাকে নিশ্চয়ই অসহায় ক্ষুদ্র ইঁদুর গ্রহণ করতে পারবে না। আমাদের সাংবাদিকতার কিংবদন্তি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার স্মৃতিচারণ থেকে বলি। তিনি গেছেন সে সময়কার পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ববঙ্গ তখন ৬ দফা, ১১ দফা দাবিতে উত্তাল। মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক সরাসরি শেখ মুজিব ও ৬ দফার পক্ষে দৃশ্যমানভাবে সক্রিয়। সেখানে দেখা হলো মানিক মিয়ার বন্ধু, পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক জেড. আই. সুলেরির সঙ্গে। সুলেরি মানিক মিয়াকে বললেন : মানিক মিয়া তোমরা তো এখন সাংবাদিকতার চেয়ে রাজনীতিটা বেশি করছ। মানিক মিয়ার দ্রুত জবাব : সুলেরি, দেশটাকে তোমরা পশ্চিম পাকিস্তানিরা এমন জায়গায় ঠেলে দিয়েছ যে, আমাদের অস্তিত্ব নিয়েই বাঁচা দায়। কাজেই আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই রাজনীতি আমাদের সাংবাদিকতায় মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই সাংবাদিকরা কখন কতটা রাজনীতি করবেন সেটা নির্ভর করে স্থান-কালভিত্তিক বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। আমাদের সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ আবুল মনসুর আহমদ, জহুর হোসেন চৌধুরী, মানিক মিয়া, শহীদুল্লাহ কায়সার, এ বি এম মূসা, নির্মল সেন বা সন্তোষ গুপ্তের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সক্রিয়তা খুবই দৃশ্যমান। বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের এই সক্রিয়তা প্রকারান্তরে রাজনীতিকেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা সবাই আবার সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের কাছেই ফিরে এসেছেন। পেশার মর্যাদা আর দলীয় বিশ্বাসের জায়গাটি একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি। ফলে সাধারণ মানুষও তাদের ওপর আস্থা হারাননি, সাংবাদিকতাও কলুষিত হয়নি। পেশাদারিত্বের এই শক্তি ধারণ করা খুবই কঠিন। বিষয়টি সবাই ধারণ করতে পারেন না বলে অনেকে সাংবাদিক হয়েও দলীয় পরিচয়ের কাছে আত্মাহুতি দেন।

৪. এ তো গেল বড়মাপের কথা। জায়গাটি যদি গুটিয়ে আনি তাহলে প্রস্তাবনাটি এমন হতে পারে : সাংবাদিকরা কি শুধু পেশাগত দায়িত্বই পালন করবেন নাকি তারা পেশার সংগঠনেও সম্পৃক্ত হবেন? হলে কতটা? এই সম্পৃক্ততা তার পেশাগত জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে বা কতটাই ইতিবাচক ছাপ ফেলবে পেশায় বা নিজের জীবনে? এই বিতর্ক যেমন এখনো চলছে : ছাত্ররা কি শুধু পাঠ্যাভ্যাসের মধ্যেই তার ছাত্রজীবনকে বৃত্তাবদ্ধ রাখবেন, নাকি তারা রাজনীতি বা সংগঠনও করবেন? আমি নিজে সংগঠন করা মানুষ। আমার নিজস্ব মত : প্রতিটি মানুষেরই সংগঠন করা উচিত। সবাই হয়তো নেতৃত্ব দেবেন না কিন্তু একটি সংগঠন পারিবারিক এবং শিক্ষাজীবনের বলয় থেকে বেরিয়ে আসা একজন মানুষকে প্রকৃত সামাজিক করে তোলে। একটা সংগঠনের নীতি, আদর্শ, লক্ষ্য এবং তা অর্জনের প্রক্রিয়া একেকজন কর্মীকে শুধু পরিশীলিত করে না বরং ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক, আঞ্চলিক এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ায় একজনকে যোগ্যতর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এই প্রক্রিয়া একজন কর্মীর মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতা হওয়ার বীজ রোপণ করে। সাধারণভাবে সমীকরণটি এ রকম হলেও পেশাজীবীদের সংগঠনের বেলায় এই শর্তের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়- সেই পেশাজীবী সংগঠনের নেতা বা কর্মী সেই পেশাটিকেই মূল পেশা হিসেবে কতটা দৃঢ়ভাবে ধারণ করেন। এ প্রশ্নের উত্তরটি জানা জরুরি। ‘পেশায় লবডংক’ এমন নেতা বা কর্মী না পেশার, না সংগঠনের- কোনোটার জন্যই ইতিবাচক নয়।

৫. স্বাধীনতা-পূর্বকালে পাকিস্তানের দুই অংশ মিলে যে সাংবাদিক ইউনিয়নের গোড়াপত্তন হয় তাতে খুব স্পষ্ট করেই বলা হয় : এই ইউনিয়নের সদস্য তারাই হতে পারবেন সাংবাদিকতাই যাদের একমাত্র পেশা, জীবিকার একমাত্র উৎস। শুধু তাই নয়, একজন সদস্য যদি চাকরি হারান বা নিজে চাকরি ছাড়েন তাহলে ছয় মাসের মধ্যে তাকে আবার পূর্ণকালীন সাংবাদিক হিসেবে ফিরে আসতে হবে। কেউ পেশার বাইরে থেকে বা নামকাওয়াস্তে পেশার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য থাকতে পারবেন না। নেতা হওয়ার তো প্রশ্নই নেই। সাংবাদিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় আমাদের পুজনীয় পূর্বসূরিদের এই দর্শনটিই হচ্ছে সাংবাদিক সংগঠনের পেশাদারিত্বের রক্ষাকবচ। পরিচয়টি সাংবাদিক কিন্তু জীবনযাপনের মূলটি অন্যত্র, এমন সদস্য না সাংবাদিকতার জন্য রক্ষাকবচ, না সংগঠনের। এই উপমহাদেশে সাংবাদিক ইউনিয়ন আর প্রেস ক্লাব প্রায় হাত ধরাধরি করে পথ চলেছে। তবে ইউনিয়ন এবং প্রেস ক্লাব শুরু থেকেই তাদের চরিত্রগত ফারাকটি চিহ্নিত করেছে খুব স্পষ্টভাবে। ইউনিয়ন বেছে নেয় প্রথামাফিক ট্রেড ইউনিয়নের পথ। রুটিরুজি, নিরাপত্তা আর পেশার মর্যাদার জায়গাটি হচ্ছে তার একচ্ছত্র অঞ্চল। সাংবাদিকদের অপরাপর সংগঠনগুলো এসব বিষয়ে ইউনিয়নের সহযাত্রী হবে কিন্তু এর মূল চালিকাশক্তি থাকবে ট্রেড ইউনিয়নের হাতেই। এই ইউনিয়নকে যারা নেতৃত্ব দেবেন তারা শুধু ‘ট্রেড’টি বুঝবেন তা নয় ‘ইউনিয়ন’ বা ‘সংঘের’ কর্মীদের রুটিরুজি, নিরাপত্তা আর মর্যাদার জায়গাটি পাহারা দেবেন কঠোর আন্তরিকতায়, নিরন্তর বিশ্বস্ততায়। আর যেহেতু এরা হবেন পেশায় সার্বক্ষণিক, পেশাই যেহেতু হবে তার জীবনযাপনের একমাত্র অবলম্বন, সেহেতু তার বা তাদের ওপর সদস্যদের আস্থা থাকবে অন্তহীন। ট্রেড ইউনিয়নের কোনো নেতা বা কর্মী যখন এই যোগ্যতা হারাবেন তখন তার যাপিত জীবন যতটাই দাপটশালী বা চাকচিক্যময় হোক না কেন তার ইউনিয়নের জীবন ‘ষোল আনাই মিছে’। পেশাদার সাংবাদিকদের আরেক ঠিকানা প্রেস ক্লাব। ক্লাব আর ইউনিয়নের ফারাকটি বোঝা গেলে এ নিয়ে আর বিভ্রান্তি থাকে না। এ দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিলটি হচ্ছে সদস্যদের পেশার সঙ্গে সার্বক্ষণিক সংশ্লিষ্টতা। ইউনিয়ন যেখানে রুটিরুজি আর পেশার নিরাপত্তা বা চাকরির নিরাপত্তার পতাকাটি উড্ডীন রাখবে, ক্লাব সেখানে পেশার মর্যাদা, পেশাজীবীদের বিনোদন, পেশার উৎকর্ষ সাধনে থাকবে আগুয়ান। দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই তবে অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের বিভাজন আছে।

 

 

 

সাংবাদিকদের আরও নানা সংগঠনের উৎপত্তি বা বিকাশ নিয়ে কোনো বিতর্ক তোলার চেষ্টা করা হলে তা হবে নিছকই কুতর্ক। নিজস্ব লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার ঠিক করে সাংবাদিকদের নানা সংগঠন গড়ে উঠতেই পারে। রিপোর্টার বা সাব এডিটর বা আলোকচিত্রীদের অথবা নারী সাংবাদিকদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলতে কোনো বাধা নেই। বরং একই ধরনের কাজে নিয়োজিত কর্মীরা যখন সংঘ গড়ে তোলেন তখন নিবিড়ভাবে নিজস্ব চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা বা তা অতিক্রম করে যাওয়ার কৌশল নির্ধারণের যেমন সুযোগ সৃষ্টি হয়; তেমনি ওই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে পেশার উৎকর্ষ সাধনের সম্ভাবনাও বাড়ে। উদ্যোগগুলো যদি যথার্থ হয়, চূড়ান্ত বিচারে তা কিন্তু সাংবাদিকতাকেই সমৃদ্ধ করে। ‘শত ফুল ফুটতে দাও’- বহুল ব্যবহারে জীর্ণ এই সেøাগানটিকে সামনে রেখে বলি : বাগানে মালির কাজ হচ্ছে নানা ফুলের সমাহারে বাগানটি বর্ণিল করে তোলা। নানা জাতের ভালো ফুলের সমাবেশ ঘটানোই তার দায়িত্ব। অকেজো আর বর্ণ গন্ধহীন ফুলের শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে এ কাজটি করা সম্ভব নয়। সংগঠনের নেতাদের কাজ সেই মালিদের মতোই। সে কারণেই সাংবাদিকদের সংগঠন করা, নেতৃত্ব দেওয়ার কথাটি যখন জোরেশোরে আলোচনায় আসে তখন উচ্চকণ্ঠে যে কথাটি বলতে হবে : প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের সক্রিয় অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে একটি সাংবাদিক সংগঠনের প্রাণশক্তি। কোন সংগঠনের সদস্য সংখ্যায় কত বেশি তা না দেখে খুঁজে দেখতে হবে সদস্যদের মধ্যে কতজন সক্রিয়, সার্বক্ষণিক পেশাদার সাংবাদিক। তাহলেই সংগঠনটি কতটা পেশাদার তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এটি রাজনৈতিক সংগঠনের মতোই। সততা, নীতি, আদর্শভিত্তিক যত কর্মীর সমাবেশ ঘটানো যাবে ততই দলের রাজনীতির গুণগতমান ভালো হবে। ফায়দালোভীরা দলে বেশি হলে তা দল ও রাজনীতি দুটোকেই ডোবায়। সাংবাদিকদের সংগঠনও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানেও অপেশাদার, ফায়দালোভীদের সমাবেশ বাড়লে সংগঠন ও সাংবাদিকতা দুটোই ডোবে। এ ধরনের সংগঠন বা নেতাদের দিকে মানুষ আঙ্গুল তোলেন। নেতার দিকে অঙ্গুলি ওঠলে সাধারণ সদস্যরাও তার দায় এড়াতে পারে না। সাংবাদিক সংগঠনের বেলায় এ কথাটিই সত্যি যে, প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকরা যত বেশি সংগঠনমুখী হবেন তত বেশি শুধু সংগঠন নয়, সাংবাদিকতাও লাভবান হবে। এ কাজটি যদি সফলভাবে করা যায় তাহলেই নিশ্চিত করা যাবে নেতৃত্বের জায়গাটিও। একটি কথা জোর দিয়ে বলি : সাংবাদিকতা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক পেশা। কাজেই সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতা হবেন তিনিই, যিনি মেধায়, মননে আধুনিক হবেন। পেশার সর্বশেষ চিত্রটি সম্পর্কে অবহিত থাকবেন। তিনি পেশার সর্বশেষ চ্যালেঞ্জগুলো কী তা যেমন জানবেন এবং তেমনি এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে যেতে কর্মীদের পথ বাতলে দেবেন। ‘একদা সাংবাদিক’ হলেই ‘চিরদিনের সাংবাদিক’ এমন সহজ সমীকরণ সাংবাদিকতায় নেই। এই পেশাটি সেই রিপোর্টারের মতোই; যিনি সারা দিন কষ্ট করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অনেক ভালো প্রতিবেদন করলেন কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দিনের সবচেয়ে গুরুত্ব খবরটিই মিস করলেন। তার সমগ্র উজ্জ্বল অতীত ম্লান হয়ে যায় সবশেষ ব্যর্থতার জন্য। সাংবাদিকতা যেমন প্রতিদিন বদলায়, সাংবাদিকদেরও সেই পথ ধরেই এগোতে হয়। ‘একদা সাংবাদিক’ বলে সাংবাদিকতার পরিচয়ে ফেরেববাজি করে জীবনযাপন করা যায় কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকদের আকাক্সক্ষা পূরণ করা যায় না। এ রকম কেউ যদি সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয় তাহলে পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য তার চেয়ে খারাপ সময় আর হতে পারে না।

৬. শেষ করি। দল, রাজনীতি, সংগঠন করার জায়গায় একজন পেশাদার সাংবাদিকের অবস্থান হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় : …ঘরের নয়, পরেরও নয়, যে জন আছে মাঝখানে…। এই মাঝখানে দাঁড়িয়েই প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক তার অবস্থান চূড়ান্ত করবেন তার প্রখর মেধাদীপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়ে; পেশাদারিত্বের মাপকাঠিটি সামনে রেখে। এটিই হচ্ছে তার এবং পেশার একমাত্র রক্ষাকবচ।   কাজটা কঠিন।   নেতিবাচক দৃষ্টান্ত আমাদের হতাশ করে। তবে আশার কথা;  আমাদের পূর্বসূরিরা আমাদের সামনে সফল ও  অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 

লেখক : সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে ও সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি জাতীয় প্রেস ক্লাব