করোনা ভাইরাস সংক্রমনের গতি কমাতে এই মুহুর্তে করনীয়

 

মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম:

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত করোনায় এক বিপর্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে।। দৈনিক সংক্রমণের হিসেবে গতকাল শনিবার পার করেছিল ৪ লক্ষের রেকর্ড । ২ মে; রবিবার সংখ্যা টা একটু কমলেও রবিবার দেশে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরো ৩ লক্ষ ৯২ হাজার ৪৮৮ জন। এ নিয়ে ভারতে মোট আক্রান্ত হলেন ১ কোটি ৯৫ লক্ষ ৫৭ হাজার ৪৫৭ জন। তবে আক্রান্ত ৪ লক্ষের নীচে নামলেও দৈনিক মৃত্যু আজ ও সাড়ে তিন হাজারের বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা দেশটিতে প্রাণ কেড়েছে ৩ হাজার ৬৮৯ জনের। ভারতে করোনা মহামারীতে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ২ লক্ষ ১৫ হাজার ৫৪২ জন।

আর করোনার দ্বিতীয় এই ঢেউয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন মহারাষ্ট্রে। আজ আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩ হাজারের বেশি। তবে কর্নাটক এবং কেরলে রবিবার আক্রান্তের সংখ্যা শনিবারের তুলনায় একটু কমেছে। কর্নাটক এবং কেরলে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৪০ হাজার ৯৯০ এবং ৩৫ হাজার ৬৩৬। উত্তরপ্রদেশেও গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজার ১৮০ জন। দিল্লিতে ২৫ হাজার ২১৯ জন। এর পর ক্রমান্বয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ; তামিলনাড়ু; অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান,হরিয়ানা, বিহার, গুজরাট মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা। এই রাজ্যেগুলিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ১০ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে।
এই মুহূর্তে দেশটিতে মোট সক্রিয় রোগী রয়েছেন ৩৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬৪৪ জন। বিপুল পরিমাণ সক্রিয় রোগী ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অক্সিজেনের অভাবে অনেক হাসপাতালে এখনো হাহাকার অবস্থা।
আমাদের দেশেও বর্তমানে দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।গত ২৪ ঘন্টায় কোভিড টেস্ট করা হয় ১৪১৫৮ জনের যার মধ্যে পজিটিভের সংখ্যা ১৩৫৯ জন।। নতুন সুস্থ হয়েছে ২৬৫৭ জন এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ৬৯ জন।

করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির পরে আমাদের দেশে সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয় গত মাসের ১৪ তারিখ থেকে কঠোর যা পরবর্তীতে ৫ মে পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।। তবে লকদাউন পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি।।একদিকে মানুষের অসহযোগিতা অন্যদিকে কারখানা সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ফলে মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া আটকানো সম্ভব হয়নি।।এরপরেও সরকারের গণপরিবহন বন্ধ; পর্যটন এলাকা বন্ধ ঘোষণা ; প্রশাসনের মাস্ক পড়তে কড়াকড়ি ; নো মাস্ক নো সার্ভিস এসবের ফলে সংক্রমণের হার কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে।। গণ পরিবহন বন্ধের ফলে আন্তঃজেলা পরিবহন পুরোপুরি অচল ।লকডাউন পুরোপুরি ভাবে সফল না হলেও এসব পদক্ষেপের কারণে সংক্রমণের হার কমে ২৩ শতাংশ থেকে কমে ৯.৬৩ শতাংশে নেমে এসেছে এখন পর্যন্ত।।যার ফলে হাসপাতাল গুলোতে রোগীর চাপ কমেছে কিছু টা হলেও।। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ভ্যাক্সিনেশনের ফলে ৯৮ % ভ্যাক্সিন নেয়া মানুষের মধ্যে ৬ বা ততোধিক মাত্রায় এন্টিবডি তৈরি হচ্ছে এবং ভ্যাক্সিন গ্রহীতাদের মধ্যে আক্রান্ত হলেও শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য সমস্যা গুলো অনেক টা কম দেখা যাচ্ছে।
(২ রা মে) রিপোর্ট অনুযায়ী কক্সবাজারে নতুন ৫০ জন করোনা পজিটিভ কেইস পাওয়া গিয়েছে এর মধ্যে ৮ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। । রোহিঙ্গাদের মধ্যে সম্প্রতি কোভিড সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তাদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা ও ক্যাম্প হতে অবাধে ঘোরাফেরা অদূর ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশংকা করা যায়।
এদিকে কক্সবাজারে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও কন্টাক্ট ট্রেসিং কমিটি প্রতিনিয়ত নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কোভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে৷ অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবক এই রমজান মাসেও কোভিড সংক্রমিত ব্যক্তি ও তাদের সংস্পর্শে আসা সম্ভাব্য ব্যক্তিদের খোঁজ নিয়ে আইসোলেশনে পাঠানো, কোভিড রোগীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহ লকডাউন বাস্তবায়নেও নিরন্তর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমরা করোনার ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি পেতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারলে সংক্রমণের হার অনেকটা কমিয়ে আনতে পারবো।
১.প্রতি জেলায় কন্টাক্ট ট্রেসিং চালু করা।। এতে শহরের বাইরে করোনা ভাইরাস ছড়ানো অনেকটা কমিয়ে আনতে পারবো সাথে যান চলাচল সীমিত করে আমরা সংক্রমণ হ্রাস করতে পারবো।

২.করোনার জন্যে ডেডিকেটেড ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে অন্যান্য ল্যাব গুলোতে সংক্রমণের হার কমানো।। তাছাড়া করোনা আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষা গুলোর জন্যে আলাদা কোভিড ডেডিকেটেড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঠিক করে দেয়া।।

৩.লকডাউন ঢিলেঢালাভাবে পালিত হওয়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে মার্কেট গুলোর খুলে দেয়ার ঘোষণা। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই দোকানীরা দোকান খুলছেন, ক্রেতাদের মাঝেও নেই সচেতনতার বালাই। মার্কেট খোলার প্রথমদিন থেকেই দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভীড়। এমতাবস্থায় মাইকিং এর মাধ্যমে ক্রেতাদের মাঝে পর্যাপ্ত সচেতনতা গড়ে তোলা, দোকানীদের কাউন্সেলিং করা ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে উৎসাহিত করা, প্রশাসনের কড়া নজরদারি তে রাখা ইত্যাদি ফলপ্রসূ পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
৪. মৃদু উপসর্গের রোগীদের জন্যে হোম মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থা করা। এতে হাসপাতাল গুলোতে রোগীর চাপ কিছুটা হলেও কমে আসবে।। সাথে প্রয়োজনীয় ঔষুধ ;অক্সিজেনের ব্যবস্থা গ্রহন।
৫. সারাদেশে সামনে ইদের সময় টাতে যাতায়াত সীমিত রাখতে কঠোর লকডাউন প্রয়োজন। নাহয় আবারো সংক্রমণ বৃদ্ধির আশংকা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রা।
৬. কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আছে। শুরুর দিকে সংক্রমণের হার কম থাকলেও বর্তমানে উদ্বেগ জনক হারে বেড়ে চলেছে।।তাছাড়া স্থানীয় এলাকায় রোহিঙ্গা দের অবাধ যাতায়াতের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সংক্রমণের হার বৃদ্ধির আশংকা দেখা দিয়েছে।এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের যাতায়াত বন্ধের মাধ্যমে রোহিঙ্গা বসতি এবং স্থানীয় এলাকা গুলোতে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।