চট্টগ্রামে মিলেছে যুক্তরাজ্য ও আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট

সিবিকে ডেস্কঃ

করোনার  দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতেই গত এপ্রিলে চট্টগ্রামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙেছে গত ১৩ মাসের। গত মাসেই চট্টগ্রামে করোনায় প্রাণ গেছে ১৩৬ জনের। আর শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ২৮৯ জন। হঠাৎ করে করোনা এতো ভয়ংকর রূপ ধারণের কারণ ছিল অজানা। তবে চট্টগ্রামের একদল গবেষক তার ধরন বের করার চেষ্টা করেছেন গত এক মাস ধরে। দশটি নমুনার ওপর গবেষণা করে তারা এখন বলছেন, এসব নমুনায় যুক্তরাজ্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌতম বুদ্ধ দাশের সার্বিক নির্দেশনায় এ গবেষাণা চালিয়েছেন বিশ্ব্যবিদ্যালয়টির অধ্যাপক ড. পরিতোষ কুমার বিশ্বাস, অধ্যাপক ড. শারমিন চৌধুরী, ডা. ইফতেখার আহমেদ রানা, ডা. ত্রিদীপ দাশ, ডা. প্রণেশ দত্ত, ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম ও ডা. তানভীর আহমদ নিজামী।

সিভাসু থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করে এ গবেষণা কার্যক্রম চালানো হয়। গবেষণার অংশ হিসেবে SARS-CoV-2 বা নোভেল করোনাভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকুয়েন্স (Whole Genome Sequence) বা জীবন রহস্য উন্মোচন করার জন্য ১০টি নমুনা পাঠানো হয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসাআইআর), ঢাকায়। এরপর বিসিএসআইআর-এর দুইজন গবেষক; ড. মো. সেলিম খান ও ড. মো. মোরশেদ হাসান সরকার এ গবেষণায় যোগ দেন। তবে গবেষণাটি মূলত চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক করা হয়েছে।

সেই ফলাফলে দেখা যায়, ১০টি নমুনার মধ্যে ছয়টিতে করোনাভাইরাসের যুক্তরাজ্যের ধরনের (B.1.1.7)  উপস্থিতি রয়েছে এবং তিনটিতে দক্ষিণ আফ্রিকান ধরন (B.1.351) রয়েছে। তবে যে ধরন (B.1.617) বর্তমানে ভারতে শনাক্ত হয়েছে, কোনো নমুনাতেই তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বয়সের আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া ওই আক্রান্ত রোগীদের পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল বলেও জানিয়েছে গবেষণা দলটি।

১০টি নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৫ এপ্রিলের আগেই যুক্তরাজ্যের ধরনের উপস্থিতি থেকে থাকতে পারে। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকান ধরনও ছিল বলে ধারণা। এক্ষেত্রে আরও বেশি নমুনা থেকে ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স করলে প্রকৃত চিত্রটি স্পষ্ট হত। এছাড়া এই ১০টি নমুনার জিনোম সিকুয়েন্সের তথ্য পাবলিক ডাটাবেজ GISAID-এ জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে কভিডের প্রথম ঢেউয়েও সিভাসুর উদ্যোগে আটটি নমুনা থেকে ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স করা হয়েছিল।

এদিকে এপ্রিলের পর মে মাসেও মৃত্যু ও আক্রান্তের হার কমছেনা। সর্বেশেষ রবিবারও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভাইরাসটির নতুন ভেরিয়েন্টের সংক্রমণের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এ ভয়ংকর অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার ওপর জোর দেন চিকিৎসকেরা।

চট্টগ্রামে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয় এপ্রিলে। এ বছরের মার্চ থেকে শনাক্ত বাড়তে শুরু করলেও গত মাসে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। মৃত্যুও হু হু করে বাড়তে থাকে। মার্চ মাসে মোট শনাক্ত ছিল ৫ হাজার ২৮৪ জন। মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ১৩ জনের।

এপ্রিলের প্রথম দিনেই রেকর্ড ৫১৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ওই দিন মৃত্যুবরণ করেন একজন। ৯ এপ্রিল এক দিনে ৫২৩ জন শনাক্ত হয়ে এক সপ্তাহের মাথায় নতুন রেকর্ড হয়। দৈনিক এবং মাসভিত্তিক মৃত্যুতেও এপ্রিল সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ১০ এপ্রিল এক দিনে সর্বোচ্চ নয়জনের মৃত্যু হয়। সেই রেকর্ড ভেঙে ২৫ এপ্রিল এক দিনে মারা যান ১১ জন। শেষ পর্যন্ত এক মাসে মারা যান রেকর্ড ১৩৬ জন।

এর আগে করোনার শুরু থেকে চট্টগ্রামে সবচেয়ে মহামারি অবস্থা ছিল গত বছরের জুন জুলাই মাসে। ওই সময় মৃত্যু এবং সংক্রমণ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। শনাক্তের সংখ্যা ও হারের দিক থেকেও তা বেশি ছিল। জুন মাসে মোট মারা যান ১০৩ জন। সে মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৮৮৩ জন। জুলাই মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৫৫ জনের। আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৩২৭ জন। আগস্ট মাসে আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৬৬০ জন। মৃত্যু হয় ৩৯ জনের।

গত বছরের ওই তিন মাসে দৈনিক শনাক্তের হারও ছিল ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে। এবারও শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছুঁয়েছে এপ্রিলের মাঝামাঝি, ১৭ এপ্রিল। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে তা ছিল ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। শেষ সপ্তাহে এসে তা শনাক্ত হার ১২ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করতে থাকে।

এত সংক্রমণ এবং মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চিকিৎসকেরা ভাইরাসটির নতুন ধরনের দ্রুত বিস্তার এবং ধ্বংসের ক্ষমতাকে দায়ী করছেন। চট্টগ্রামের একমাত্র বিশেষায়িত কোভিড-১৯ চিকিৎসাকেন্দ্র জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মো. আবদুর রব বলেন, এই ধরনের বিস্তার এবং ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা খুব বেশি। এ কারণে আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যু বাড়ছে। রোগীর অবস্থাও খারাপও হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত।