রামু’র টাকশাল এবং অন্যান্য ইতিহাস

অ্যাডভোকেট শিরুপন বড়ুয়া:

একদা রামুতে ছিলো টাকশাল। অর্থাৎ টাকা তৈরির কারখানা! কোথায় ছিলো সেই টাকশাল? কালের গর্ভে রামু’র টাকশাল হারিয়ে গেলেও সেই টাকশালে তৈরি টাকা ইতিহাসের পাতা থেকে একদম হারিয়ে যায়নি। এখনো বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে রামু’র টাকশালে তৈরি হওয়া টাকা বা মুদ্রা প্রদর্শিত হচ্ছে। এমনকি বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও সংরক্ষিত আছে রামু’র টাকশালে তৈরি মুদ্রা। টাকশাল এবং মুদ্রার বিষয়ে আমরা সবাই কম বেশি জানি। তারপরও এ বিষয়ে একটু সহজ ধারনা দিচ্ছি।
আদিম যুগে গুহা মানবরা শস্যের সাথে শস্য বিনিময় করতো। গুহা ছেড়ে মানুষ যখন সভ্যতার আলোতে আসতে লাগলো, তখন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কড়ি,পুথি,দামি পাথর ইত্যদির ব্যবহার শুরু করলো। এরপর আসলো ধাতব মুদ্রার ব্যবহার। ধাতব মুদ্রা বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি হতো,যেমন ব্রোঞ্জ, তামা, রুপা। স্বর্ণ মুদ্রা ছিলো এধরণের মুদ্রার মধ্যে সবচেয়ে দামী। এই ধাতব মুদ্রা কিন্তু আজকের কাগুজে টাকার নোটের চেয়েও বেশি সময় ধরে পৃথিবী শাসন করেছে! এর ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। অন্য দিকে কাগুজে মুদ্রার ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। ধাতব মুদ্রার সাথে তুলনা করলে কাগুজে টাকা একদম নতুনই বলা চলে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শাসকদের আমলে ভিন্ন ভিন্ন শহরে এই ধাতব মুদ্রা তৈরি করার জন্য টাকশাল ছিলো। যে শহরে ধাতব মুদ্রা তৈরি করা হতো, সেই শহরকে বলে Mint Town, বা টাকশাল এর শহর। আর Mint হচ্ছে টাকশাল। আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। এখানে অতীতের পরাক্রমশালী শাসকরা তাঁদের নিজ নামে মুদ্রা চালু করতেন। মূলত স্বাধীন শাসকরাই নিজ নামাঙ্কিত মুদ্রা চালু করতে পারতেন। অবশ্য মাঝেমধ্যে প্রাদেশিক গভর্নর নিজ নামে মুদ্রা তৈরি করতেন। অনেক শাসক আবার নিজ নামাঙ্কিত মুদ্রা চালু করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন। তাই মুদ্রা একটি ঐতিহাসিক উপাদানও বটে। কারন এই ধাতব মুদ্রা থেকে ভিন্ন ভিন্ন শাসকদের নাম এবং সে সময়কার ইতিহাসের যেমন খোঁজ মিলে,ঠিক তেমনি এমন শাসকের নামও উঠে আসে,যাঁর কথা হয়তো ইতিহাস বইতে পাওয়াই যায় না। এই ধাতব মুদ্রা দিয়ে একজন শাসকের শাসনকাল সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। মুদ্রায় স্বর্ণের পরিমাণ কতটুকু আছে তা প্রমাণ করে ঐ সময়ে ঐ মুদ্রা চালু করা শাসক অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী ছিলেন।

এবার আসি রামু’র টাকশাল প্রসঙ্গে। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের লেম্রো বংশের রাজা নারামিখলা বর্মী আভা রাজ্যের শাসকের হাতে নিজ রাজ্য হারিয়ে বাংলার গৌড়ে আশ্রয় নেন। সেসময় গৌড় ছিলো স্বাধীন বাংলার সুলতানদের রাজধানী। পরবর্তীতে নারামিখলা ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মুসলমান সুলতানের সহায়তায় হারানো আরাকান রাজ্য পুনরায় জয় করেন, এবং ম্রোক-উ নামে একটি নতুন শহরের পত্তন করে একে নতুন রাজধানীর স্বীকৃতি দেন। এটাই ছিল ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বর্মীরাজা বোধপায়া কর্তৃক আরাকান দখল করার আগ পর্যন্ত আরাকানের রাজধানী। নারামিখলা রাখাইন পদবী ‘মিন সো মোন’ নামে ১৪৩০ খ্রিঃ থেকে ১৪৩৩ খ্রিঃ পর্যন্ত আরাকান শাসন করেন। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীরা সবাই বৌদ্ধ হলেও বাংলার মুসলমান সুলতানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য রাখাইন নামের পাশাপাশি ইসলামিক পদবী ব্যবহার করতেন। যার প্রমাণ এসব শাসক কর্তৃক প্রবর্তিত মুদ্রায় দেখতে পাওয়া যায়। তবে আরাকানের রাখাইন রাজাদের ইসলামিক নাম গ্রহনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিলো বাংলার সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তাই এসব আরাকানিজ শাসক কর্তৃক চালু করা মুদ্রা বিশেষ করে বাংলার সাথে বানিজ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হতো। আরাকানিজ এসব মুদ্রায় একইসাথে রাখাইন, বাংলা এবং অারবি অথবা ফার্সী ভাষা উৎকীর্ণ থাকতো। শুধু তাই নয়, এধরনের মুদ্রায় বাংলার সুলতানি রীতি লক্ষ্যনীয়। এসব মুদ্রা প্রথম দিকে রামু’র টাকশালে তৈরি হতো। তবে চট্টগ্রামের টাকশাল থেকেও বেশ কিছু আরাকানিজ শাসকের মুদ্রা তৈরি হয়েছিল।
এই মুদ্রাগুলো ইতিহাসে ‘ Chittagong Trade Coin’ নামে পরিচিত। যা এখন খুবই দুর্লভ।

মিন সো মোন এর মৃত্যুর পর মিন খারি (১৪৩৩ খ্রিঃ-১৪৫৯ খ্রিঃ) ইসলামিক নাম ‘আলি খান’ গ্রহণ করেন এবং রামু দখল করেন। সম্ভবত আরো কয়েক দশক পর রামুতে টাকশাল গড়ে উঠে।

আরাকান রাজা মিন বিন (১৫৩১ খ্রিঃ-১৫৫৩ খ্রিঃ) এর একটি মুদ্রা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে, যাতে তাঁর ইসলামিক নাম ‘জাবুক শাহ’ উৎকীর্ণ আছে (তিনি তাজ শাহ্ নামেও পরিচিত)। মুদ্রাটি রামু’র টাকশালে রুপা দিয়ে তৈরি,এবং এর ওজন ৯.৮১ গ্রাম। রাজা মিন বিন এর শাসনামলে চট্রগ্রমের আরাকানিজ গভর্নর ছিলেন রাজা চান্ডিলা। তিনি প্রথমে রামু’র গভর্নর ছিলেন। রাজা মিন বিন এর সময় কিছুদিনের জন্য চট্টগ্রাম ত্রিপুরা রাজার কাছে হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু মিন বিনের অাদেশে রাজা চান্ডিলা ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পুনরায় দখল করেন। তিনি রামুতে চেইন্দা রাজা নামে পরিচিত। এখনো রামুতে চেইন্দা নামে একটি জায়গা আছে। এই চান্ডিলা রাজার ইসলামিক নাম ছিলো থান্ডালা শাহ্। এটা জানা যায় রামু’র টাকশাল থেকে চালু হওয়া তাঁর একটি মুদ্রা থেকে। ঐ মুদ্রাটি আরাকান রাজা মিন বিন এর গভর্নর হিসেবে রাজা চান্ডিলা রামু থেকে তৈরি করেন, এবং তাতে তাঁর ইসলামিক নাম ‘থান্ডালা শাহ্’ উৎকীর্ণ আছে। মুদ্রাটি রুপা দিয়ে তৈরি, যার ওজন ১০.৪৭ গ্রাম। মূলত চট্টগ্রাম জয় করে পুনরায় আরাকানের সাথে যুক্ত করার পর চান্ডিলা রাজা এই মুদ্রাটি চালু করেন। এই মুদ্রায় যা উৎকীর্ণ আছে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করলে এমনটাই হবে-“the victorious Thandala Shah,Sultan son of the noble Mahibinyan,may He prepetuate his reign and authority “. অর্থাৎ এখানে থান্ডালা শাহ্ বা চান্ডিলা রাজাকে বিজয়ী এবং মাহিবিয়ানের পুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি বিষয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে, যদিও এই চান্ডিলা রাজা আরাকান রাজা মিন বিন এর নিয়োজিত চট্টগ্রাম এবং রামুর গভর্নর ছিলেন তথাপি রামু’র টাকশাল থেকে তৈরি হওয়া এই মুদ্রায় তাঁকে ‘সুলতান’ বলা হয়েছে। তারমানে চান্ডিলা রাজা বা থান্ডালা শাহ্ কি নিজ নামে মুদ্রা চালু করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন? তিনি কি রামু এবং চট্টগ্রামে কিছুদিনের জন্য স্বাধীন একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? এসব উত্তর হয়তো ভবিষ্যতে জানা যাবে।

এতক্ষণে পাঠকের মনে কিছু প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বর্তমান রামু উপজেলায় যে আরাকানিজ টাকশাল ছিল সেটার অবস্থান কোথায় ছিল? রামুতেই কেনো আরাকানের টাকশাল ছিলো?

টাকশাল যেহেতু রাজার রাজকোষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান, তাই টাকশাল এর কার্যক্রম মূলত দূর্গের ভেতরে সুরক্ষিত স্থানেই পরিচালিত হতো। রামু মুঘলদের অধীনে আসার আগে কয়েকশত বছর আরাকানের অধীনে ছিলো। ভেনেশিয়ান পর্যটক নিকোলো ডি কন্টিকে মনে করা হয় আরাকানে আসা প্রথম ইউরোপীয় পর্যটক। যিনি ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে আরাকান ভ্রমন করেন এবং তাঁর আরাকান ভ্রমনের বর্ণনায় রামু জনপদকে আরাকানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ বলে উল্লেখ করেন। এই প্রদেশটি আরাকান রাজ মনোনীত প্রাদেশিক গভর্মেন্ট দ্বারা পরিচালিত হতো। মধ্যযুগে যে কয়জন ইউরোপীয় পর্যটক রামুতে এসেছিলেন,তাঁদের লিখিত বর্ণনায় রামু’র আরাকানিজ প্রাদেশিক গভর্মেন্টের কথা জানা যায়। তাদের মধ্যে সেবেস্টিয়ান ম্যানরিক অন্যতম।
রামু’র রামকোট নামক স্থানে ছিলো আরাকানিজ দূর্গ। মুঘলরা এ দূর্গকে মগ দূর্গ হিসেবে উল্লখ করেছে। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হুকুমে বাংলার সুবেদার শায়েস্তাখান বুজর্গ উমেদ খানকে আদেশ দেন চট্রগ্রামকে আরাকান মুক্ত করতে। বুজুর্গ উমেদ খান ১৬৬৬ সালে চট্রগ্রামকে মুঘল পতাকাতলে নিয়ে আসেন। এরপর বুজুর্গ উমেদ খানের আদেশে রামুুর রামকোটে অবস্থিত আরাকানিজদের শক্তিশালী দূর্গটি ধ্বংস করা হয়। মুঘলদের রামু আক্রমণের বর্ণনায় রামকোট দূর্গের কথা জানা যায়। সেই রামকোট দূর্গেই ছিলো রামু’র টাকশাল। এই রামকোট এলাকা থেকেই রামু খিজারী অাদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক প্রয়াত শ্রদ্ধেয় বাবু জ্ঞানেন্দ্র বড়ুয়া একটি মধ্যযুগীয় আরাকানিজ মুদ্রা খুঁজে পান। আরাকানিজ মুদ্রার ইতিহাসে এটা ছিলো এক গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার। এই টাকশাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন আরাকানিজ শাসকদের মুদ্রা তৈরি হয়। এমনকি চট্টগ্রামেও একটি আরাকানিজ টাকশাল ছিলো।
আরাকানের মিন রাজা (১৫০১ খ্রিঃ-১৫১৩খ্রিঃ)যাঁর মুসলমান নাম ছিলো সিকান্দার অর্থাৎ আলেক্সান্ডার। তাঁর নামাঙ্কিত একটি রোপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়, যা রামু’র টাকশাল থেকে তৈরি করা হতো। এই মুদ্রাটির ওজন ৯.৬৪ গ্রাম। রামু’র টাকশালে তৈরি আরো একটি রোপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়, যাতে আরাকান রাজা গজপতি’র (১৫১৩ খ্রিঃ-১৫১৭ খ্রিঃ) নামাঙ্কিত আছে। এই মুদ্রায় আরাকান রাজা গজপতিকে ফার্সী লিপিতে ইলিয়াস শাহ্ নাম ধারন করতে দেখা যায়। মুদ্রাটির ওজন ৯.৭৯ গ্রাম।
অারাকান রাজা থাজাটা (১৫১৫ খ্রিঃ-১৫২১ খ্রিঃ) রামু’র টাকশালে তাঁর নামাঙ্কিত রোপ্য মুদ্রা চালু করেন,যাতে তিনি ফার্সীতে আলি শাহ্ নাম ধারন করেন।এই মুদ্রার ওজন ৮.৮৪ গ্রাম।

রামকোট বা এর আশেপাশেই হয়তো টাকশালটি মাটিচাপা পড়ে আছে। যদি সঠিকভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে এর খোঁজ করা হয়, তবে ইতিহাসের পাতায় রামুর নাম আরো উজ্জ্বল হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বিঃদ্রঃ লেখাটি একটি গবেষণার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

তথ্যসূত্রঃ

১।Thibaut d’Hubert, The journal of Burma Studies,Vol.19, “The Lord of the Elephant:Interpreting the Islamic Epigraphic,Numismatic and Literary Material from the Mrauk U period of Arakan (ca.1430-1784)
২।Aye Chan, The kingdom of Arakan in the Indian Ocean Commerce (AD 1430-1666)
৩। Major R.E Roberts, An account of Arakan written at Islamabad (Chittagong) in June 1777 [article ].
৪। Stephen Album rare Coins.
৫। U Bodhinhana, An outline od the Arakanese rule in Southeast Bengal [article ],Arakanese Research Journal, Vol.1
৬। Banglapedia.
৭।ছবি- Internet.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •